সরদার আমীর আজম
সরদার আমীর আজমআমেরিকা এবং বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির সংক্ষিপ্তপ্রেক্ষিত
"When America sneezes the world catches a cold" “আমেরিকাহাঁচি দিলে সারা পৃথীবি সর্দিতে আক্রান্ত হয়”, সাধারন্যে এ প্রবাদটিবেশ প্রচলিত। অথবা হাওয়ার্ড সরকারের আমলে মাঝে মাঝে শোনাযেত, “if it rains in Washington, Australian administration opens umbrella in Canberra” “ওয়াশিংটনে বৃষ্টি হলে ক্যানবেরাপ্রশাসন মাথায় ছাতা ধরে”। আবার এও বলা হয়, আমেরিকারপ্রেসিডেন্ট শুধু আমেরিকারই প্রেসিডেন্ট নয়, আমেরিকার বাইরেঅবশিষ্ট পৃথিবিতেও বিরাট একটা ভূমিকা রেখে থাকে, যাকে আরেককথায় ‘মোড়লিপনা’-ও বলা হয়ে থাকে। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও ধনী রাষ্ট্র এবং সর্ববৃহৎ অর্থনীতি আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বের উপর কিভাবে প্রভাব বিস্তার করে আছে এসব তারই ইংগিতবহ।

১৯২৯ সালে আমেরিকার শেয়ার মার্কেটে ধস নামার কারনেআমেরিকার অর্থনীতিতে যে গভীর সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল তা “The Great Depression” নামে খ্যাত এবং সারা পৃথীবির অর্থনীতিকেপ্রচন্ডভাবে নাড়া দিয়েছিল। পরবর্তিতে সাম্প্রতিককালে প্রায় আটদশক পরে ২০০৮সালে আমেরিকাতে প্রায় একই ধরনের শেয়ারমার্কেট ধসের কারনে যে সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল ইহা কিভাবে সমগ্রপৃথীবিকে প্রভাবিত করেছিল তা আমাদের সবারই জানা। অন্যদিকে, ১৯৩৩ সালে একনায়ক নাৎসি হিটলারের আবিইর্ভাবের পরে যখন১৯৩৯ সালে জার্মানী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধিয়ে একমাত্র স্পেন ওপর্তুগাল ছাড়া প্রায় সারা ইউরোপকে ঝটিকার বেগে দখল করেইংলিশ চ্যানেলের ওপারে ব্রিটেনকে বিমান ও নৌ যুদ্ধের মাধ্যমেনাস্তানাবুদ করে ফেলে এবং পূর্বে অন্যতম শক্তিধর রাশিয়াকেপ্রচন্ডভাবে আক্রমন করে মস্কোর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়ে সারা পৃথিবীকে জার্মানীর কব্জায় আনার স্বপ্ন দেখছিল, তখন আটলান্টিকের ওপারেনিরাপদ দূরত্বে থাকা অন্যতম শক্তিধর আমেরিকাই ছিল বাঁচাবারপ্রধান ভরসা।

আর বিশেষ করে ৯০ দশকের প্রথম দিকে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (সাধারন্যে রাশিয়া নামে পরিচিত) নিয়ন্ত্রিত কমিউনিষ্ট বিশ্বের পতনের পর থেকে আমরা দেখেছি সারা বিশ্বে সেতোআমেরিকার “one-man-show”-র মত অবস্থা, যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন নামক ঐ বিশাল ফেডারেল রাষ্ট্রটির অধীনস্থ ইউক্রেন, বেলারুশ, কাজাখাস্তানসহ ১৪টি প্রজাতন্ত্রকে এবং একইসাথে Warsaw Pact-এর আওতাধীন কমিউনিষ্ট বলয়ভুক্ত পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলিকে (পোলান্ড, হাংগেরি, চেকোশ্লোভাকিয়া, ইত্যাদি) হারিয়ে রাশিয়ার প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ার মত অবস্থা হয়ে পড়েছিল।উল্লেখ্য, পূর্ব ইউরোপীয় সেই রাশিয়ার বলয়ভুক্ত দেশগুলির প্রায় সবাই এখন অর্থনৈতিক স্বার্থে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU)-এ যোগদানকরেছে। অবশ্য ইদানীংকালে রাশিয়া নিজ শক্তিতে অনেকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে মনে হচ্ছে, যা অন্ততঃপক্ষে বর্তমানে সিরিয়ার অত্যন্ত জটিল ত্রিমাত্রিক (আসাদ সরকার-বিদ্রোহী গ্রুপ-আইএস) যুদ্ধে ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়ার সিরিয় সরকারকে সহায়তাদানের নামে সরব উপস্থিতি দেখে বোঝা যায়, যেখানে আসাদ সরকার আমেরিকা সমর্থিত বিদ্রোহী এবং আইএস-দেরকে প্রায় নিয়ন্ত্রনের মধ্যে মধ্যে নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে গত ২/৩ দশক ধরে এবং বিশেষ করে একুশ শতকের সূচনালগ্ন থেকে বিশ্বায়নের প্রেক্ষিতে ক্রমবর্ধমান লক্ষ্যনীয়অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি এবং একইসাথে অন্যতম সামরিক দিকে থেকে পরাশক্তি হিসেবে চীনের আবির্ভাব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ভূ-রাজনৈতিক হিসেব-নিকেষ অনেকটা পাল্টে দিয়েছে। মাথাপিছু আয়ের দিক থেকেএখনো আমেরিকার অনেক পেছনে থাকলেও আমেরিকার চেয়ে প্রায়৫ গুন বেশি জনসংখ্যা হওয়ার কারনে সামষ্টিক অর্থনীতির(macroeconomics) হিসেবে চীনের অর্থনীতি আকারে এখনআমেরিকার অর্থনীতিকে ছুঁই ছুঁই কিংবা ছাড়িয়ে যাওয়ার মত অবস্থা, যা কিনা আমেরিকার মাথাব্যাথার কিংবা অনেকটা হীনমান্যতায় (inferiority complex) ভোগার কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পাশাপাশি, সাবেক Warsaw চুক্তিভূক্ত পূর্ব ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলি, সাবেক যুগোশ্লাভিয়া রাষ্ট্রের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া প্রজাতন্ত্রগুলি এবং অন্যান্য পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলির যোগদানের প্রেক্ষিতে EU আরোশক্তিশালী একটি অর্থনৈতিক গ্রুপ হিসেবে আবির্ভূত হলেও, সাম্প্রতিককালের ব্রেক্সিট (BREXIT)-এর মাধ্যমে নাটকীয়ভাবেব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেড়িয়ে যাওয়া এককালেরশক্তিশালী ইউরোপকে নিয়ে সৃষ্টি করেছে অনেক বিতর্ক ও জল্পনা-কল্পনার, যদিও ব্রিটিশদেরও তাদের জাতীয় স্বার্থকে ইউরোপীয় স্বার্থের উপরে বিবেচনায় নেয়ার পেছনে যথেষ্ট কারন ছিল বলে প্রতীয়মান।আর Warsaw চুক্তি থেকে পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলির বেরিয়ে আসারকারনে ঐ চুক্তিটির প্রাকৃতিক মৃত্যু হওয়ায় NATO-র অস্তিত্বওঅনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়েছে, যেকারনে ইহার কাজের পরিধি এখনইউরোপ ছাড়িয়ে আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে সম্প্রসারিত হয়েছে মূলতঃ ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের উগ্র আরবজাতীয়তাবাদ এবং নতুন আবির্ভূত ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননেরঅংশবিশেষ জুড়ে ইসলামিক রাষ্ট্রের (ISIS-Islamic State of Iraq and Syria) সহিংস মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদ রোধের প্রেক্ষিতে।

পক্ষান্তরে, আয়তনে ছোট হলেও এশিয়ায় জাপান এই অঞ্চলের উন্নত রাষ্ট্রের শীর্ষে অবস্থান করছে এবং একটি বড় শক্তি হিসেবে বিবেচ্য, যেখানে চীন, দক্ষিন কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলিপাল্লা দিয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে উন্নত বিশ্বের কাতারে সামিল হওয়ার দিকে ধাবমান। দক্ষিন এশিয়ায় পৃথীবির দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশ ভারতও এই বিশ্বায়নের যুগে তথ্য-প্রযুক্তির উন্নয়নের সুযোগের সদ্ব্যবহার করে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের দিকে এগোচ্ছে এবং নিউক্লিয়ার সক্ষমতা অর্জনের আলোকে এশিয়ার অন্যতম একটি বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অন্যদিকে, নিউক্লিয়ার সক্ষমতা অর্জনের আলোকে পাকিস্তানও এশিয়ার মধ্যে একটি বড় শক্তির দাবিদার, যদিও অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে এবং ধর্মীয় মৌলবাদের কারনে অনেক পিছিয়ে আছে। এসবের মধ্যেমাঝে মাঝে সংবাদের শিরোনামে চলে আসছে প্রায় একঘরে হয়ে থাকাউত্তর কোরিয়া নামক চীনের প্রতিবেশী এই ছোট্ট দেশটি, মাঝে-মধ্যেদূরপাল্লার মিসাইল উৎক্ষেপন করে এবং নিউক্লিয়ার সক্ষমতা অর্জনকরেছে বলে। একমাত্র শিয়া অধ্যুষিত দেশ হিসেবে তেলসমৃদ্ধ ইরানওআমেরিকার অনেকটা মাথাব্যাথার কারন মধ্যপ্রাচ্যে, সাম্প্রতিককালেইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনের যুদ্ধমান পরিস্থিতিতে অংশীদারহয়ে।

দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারের কারনে আমাদের বাংলাদেশও দ্রুত মধ্যম আয়ের দেশে পরিনত হওয়ার দিকে ধাবমান, যেকারনেআমেরিকাসহ উন্নত অনেক দেশের দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের দিকেওঝুঁকেছে। মাত্র কয়েকমাস আগে ওবামা সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী জনকেরি এক ঝটিকা সফরে এসে বাংলাদেশ ঘুরে গেল যা ছিল অনেকটাচমকের মত। সেইসাথে, আমাদের ১৯৭১ সালের সশস্ত্রমুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে আমেরিকার সাথে আমাদের সেই তিক্ততমইতিহাসও আমদের জানা, যখন মার্কিন সরকার (কিন্তু জনগন নয়) ন্যক্কারজনকভাবে পাকিস্তানকে সমর্থন জানিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধাচরন করেছিল।

প্যাসিফিক অঞ্চলে মহাদেশের ন্যায় অষ্ট্রেলিয়া উন্নত বিশ্বের একনির্ভরযোগ্য সহযোগী হিসেবে অবস্থান করছে, যার রয়েছে এত দূর থেকে হলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কসহ বিভিন্ন ইউরোপিয়ান ফ্রন্ট এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের বিরুদ্ধে মিত্র শক্তির হয়ে যুদ্ধ করার স্মরনীয় ইতিহাস। উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তরপরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে নর্দান টেরিটরির Alice Springs-এ রয়েছেঅষ্ট্রেলিয়া-আমেরিকার যৌথ পরিচালনায় একটি স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড ষ্টেশন (প্রকারন্তরে একটি সামরিক ঘাটির মত) এবং সাম্প্রতিককালে ডারউইনে ২,৫০০ নৌ-সেনার একটি আমেরিকান মেরিন বেস স্থাপন করা প্রায় চূড়ান্ত।

এছাড়া আমেরিকায় ঘটে যাওয়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন এবং আকস্মিক ঘটনাও সারা বিশ্বের দৃষ্টি কাড়ে। ১৯৬৩ সালের নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ। তখন দক্ষিন বাংলার পিরোজপুর জেলার অজ পাড়াগাঁয়ের এক প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র মাত্র। স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে শিক্ষক ও স্কুল কমিটির মুরব্বীরা খুব গুরুত্বসহকারে আলোচনা করছিলেন তৎকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার খবরাদি নিয়ে। তখনকার দিনে সেই অজ পাড়াগাঁয়ে তাৎক্ষনিক খবরের একমাত্র মাধ্যম ছিল পাশেই গ্রামের বাজারের একটি দোকানের একটি মাত্র রেডিও (ঢাকা থেকে লঞ্চযোগে প্রাপ্ত পত্রিকা পাওয়া যেত ২/৩ দিন পরে)। শক্তিধর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বলেই কিনা কথা, রেডিওর মাধ্যমে প্রাপ্ত যার নিহত হবার খবর সেই অজ পাড়াগাঁয়েও অনেকটা ঢেউ খেলেছিল, যা প্রতক্ষ্য করেছিলাম মাত্র ৯ বছর বয়সেই এবং অনুধাবন করতে পেরেছিলাম আমাদের রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে আমেরিকার গুরুত্ব। এরপর দেখেছি ১৯৭১ সালে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন জাতীয় ঘটনা স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বড় অহংকার মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকার ন্যাক্কারজনক ভূমিকা। তখন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের আমল, যাকে আমরা পরবর্তিতে দেখেছি আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম সাড়া জাগানো ও বহুলালোচিত ‘ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডাল’-এর দায়ভার কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ করতে হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। এরপর রিপাবলিকান জর্জ বুশ (সিনিয়র)-এর আমলে দেখেছি ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত দখল-পরবর্তি পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে ঘাটি গেড়ে ইরাকের সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। ডেমোক্রাট প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের ক্ষমতাকালের শেষ দিকে দেখা গেছে আরেক সাড়া জাগানো ন্যক্কারজনক ‘সেক্স স্ক্যান্ডাল’, যদিওবা জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে অপসারনের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। এরপর ২০০০ সালে আসে রিপাবলিকান জর্জ বুশ (জুনিয়র)-এর আমল, যে ক্ষমতায় এসেছিল শুধুমাত্র ইলেক্টরাল ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কিন্তু প্রতিদ্বন্দী ডেমোক্রাট প্রার্থী আল গোরের চেয়ে অর্ধ মিলিয়ন কম পপুলার ভোট পেয়ে। তার আমলেই ঘটেছিল ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সৌদি নাগরিক ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়েদা (আফগানিস্তান থেকে রাশিয়ানদের হটানোর প্রেক্ষিতে আমেরিকারই সৃষ্ট) কতৃক নিউ ইয়র্কের ‘টুইন টাওয়ার’ ধ্বংস যা ধর্মীয় মৌলবাদকে আমেরিকার রাজনীতিতে সামনে নিয়ে এসেছিল এবং পরবর্তিতে ২০০৩ সালে ঘটেছিল মিথ্যা ‘রাসয়ানিক অস্ত্র’ থাকার অজুহাতে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে হটানো, যা মুসলিম বিশ্ব ও আমেরিকার মধ্যে অনেক কিছুর মাঝে একটি অবিশ্বাসের সৃষ্টি করেছিল। আর এর পরিনতিতে জন্ম নেয় ইরাকের ক্ষমতাচ্যুত সুন্নীদের মধ্যে ‘ইসলামিক’ মৌলবাদের প্রবনতার উত্থান এবং পরবর্তিতে জন্ম নেয় ইরাক ও সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল ভিত্তিক IS অর্থাৎ ইসলামিক ষ্টেট-এর, যাদের দখলিকৃত এলাকা পুনরুদ্ধারে চলছে এইমুহুর্তে আমেরিকা, রাশিয়া, তুরস্ক, কুর্দি ও ইরানী মিলিশিয়াসহবহুজাতিক বাহিনীর বহুমাত্রিক যুদ্ধ। অন্যদিকে, ইসরায়েলকে আগা-গোড়া শর্তহীনভাবে সমর্থন দিয়ে প্যালেষ্টাইনীদের ন্যায্য অধিকার ওপূর্ন স্বাধীনতাকে বারবার অস্বীকার ও অগ্রাহ্য করে যাওয়ায়আমেরিকার সাথে মুসলিম বিশ্বের অদৃশ্য টানাপোড়েন চলছেই।যাইহোক, বুশ প্রশাসনের উপরোক্ত ভ্রান্ত বৈদেশিক নীতির পাশাপাশি অভ্যন্তরীন অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে বিভিন্ন ভ্রান্ত নীতির কারনে ২০০৮ সালের মাঝামাঝি আমেরিকার শেয়ার মার্কেটে হঠাৎ করে দরপতনের ধ্বস নামায় অর্থনীতি গভীর সঙ্কটে পড়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে সৃষ্টি হয় এক ইতিহাস সৃষ্টিকারী ঘটনার – সারা বিশ্বকে চমকে দিয়ে ডেমোক্রাট পার্টির প্রার্থী বারাক ওবামা আমেরিকার ইতিহাসে প্রথমবারের মত একজন আফ্রো-আমেরিকান কৃষ্ণাংগ হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিন্তু প্রথম দফার শাসনামলে ভাল করলেও দ্বিতীয় দফায় ওবামা প্রশাসন তেমন একটা ভাল করতে পারেনি বিভিন্ন ক্ষেত্রে। বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, ইত্যাদি সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পরতে হয়েছে। অন্যদিকে, বানিজ্যনীতির ক্ষেত্রে নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (NAFTA) এবং ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (TPP) চুক্তি দু’টি অভ্যন্তরীন ক্ষেত্রে আমেরিকা অনেক শিল্পকে রুগ্ন করে ফেলায় এবং বেকার সমস্যাবাড়িয়ে দেয়ায়, মধ্য-উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু শিল্প-প্রধান অংগরাজ্যেবেশ বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। পক্ষান্তরে, প্রার্থী নির্বাচনেরপ্রাইমারী চলাকালীন সময়ে বেশ কিছু সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ঘটায় মুসলিমঅভিবাসীদের ব্যাপারেও আমেরিকানদের মাঝে অনেকটা বিরুপপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, যার প্রতিফলন বিশেষ করে রিপাবলিকান প্রার্থীবাছাইয়ে প্রভাব বিস্তার করে – ফলতঃ রিপাবলিকান পার্টির নমিনেশন পেয়ে চমক সৃষ্টি করে রাজনীতিতে একেবারে নতুন ও নাম-না-জানা রিয়াল এষ্টেট ‘টাইকুন’ বিলিয়নিয়ার ডোনাল্ড ট্রাম্প।

নির্বাচন ২০১৬ - টান টান উত্তেজনাপূর্ন প্রচারনা এবংডোনাল্ড ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত জয়
প্রতি ৪ বছর পর পর নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের পরের মঙ্গলবারে (যা আইন করে সংবিধিবদ্ধ) অনুষ্ঠিত হয় গনতান্ত্রিক বিশ্বের পুরোধা মার্কিন যুক্ত্ররাষ্ট্রের এই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, যা সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষন করে। সেই হিসেবে ২০১৬ সালের নির্বাচনের তারিখ ছিল ৮ নভেম্বর। যাইহোক, উপরোল্লিখিত প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ২০১৬ সালের ডেমোক্রাটিক পার্টি প্রার্থী হিলারি কিন্টন এবং রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দিতাপূর্ন, প্রচারনামুখর, এবং বিতর্কিত ও নোংরা বক্তব্যে ভরপুর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। যেমনটি আমরা সবাই দেখেছি, সমস্ত মিডিয়াজরীপের পূর্বাভাসকে উল্টে দিয়ে শেষ পর্যন্ত শুধুমাত্র রাজ্যভিত্তিকইলেক্টরাল ভোট বেশি পেয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবেনির্বাচিত হয়েছে, যদিও হিলারি ক্লিন্টন সবগুলি রাজ্যের সর্বমোট ভোটের হিসেবে ট্রাম্পের চেয়ে ২.৯ মিলিয়নেরও (২৯ লাখ) অধিক পপুলার (জনগনের) ভোট পেয়েছে।

পপুলার ভোট বনাম ইলেক্টরাল ভোটঃ আমরা যারা সংসদীয়পদ্ধতিতে নির্বাচন দেখে অভ্যস্ত (বাংলাদেশ, অষ্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, ভারত, ইত্যাদি দেশে) তাদের কাছে আমেরিকার ফেডারেল পদ্ধতিতেপ্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনেকটা ভিন্নতর এবং কিছুটা বিভ্রান্তিকরও।যদিও জনগন সরাসরি ভোট দেয়, কিন্তু প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করারচূড়ান্ত নিয়ামক শক্তি প্রতিটি রাজ্যের জন্য ইহার জনসংখ্যারআনুপাতিক হারে নির্ধারিত ইলেক্টরাল ভোটগুলি। ৫০টি অংগরাজ্যের৫৩৫টি ইলেক্টরাল ভোট (৪৩৫টি হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভ + ১০০সিনেট সিটের উপর ভিত্তি করে) এবং সেইসাথে রাজধানী ওয়াশিংটনডিসি-র (আলাদা রাজ্য হিসেবে গন্য নয়) ৩টি ইলেক্টরাল ভোট নিয়েসর্বমোট ৫৩৮টি ইলেক্টরাল ভোট নিয়ে গঠিত ইলেক্টরাল কলেজচূড়ান্তভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে (উল্লেখ্য, ওয়াশিংটন ডিসিএকটি ফেডারেল ক্যাপিটাল টেরিটরি, তাই অংগরাজ্য হিসেবেবিবেচিত নয়, যদিও প্রশান্ত মহাসাগর উপকূলে উত্তর-পশ্চিম কোনেওয়াশিংটন নামে আলাদা একটি অংগরাজ্য আছে যার ইলেক্টরালভোটের সংখ্যা ১০টি। সুতরাং, রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি এবংওয়াশিংটন অংগরাজ্য আলাদা)। যাইহোক, যে প্রার্থী পপুলার ভোটেতার বিজয়ী হওয়া রাজ্যগুলির ইলেক্টরাল ভোটগুলি যোগ করে বেশীইলেক্টরাল ভোট পায় সে-ই প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়। যদিও নির্বাচনের দিনই এটা জানা হয়ে যায়, তবে ৫৩৮টি ইলেক্টরাল ভোটনিয়ে গঠিত ইলেক্টরাল কলেজ পরবর্তিতে ডিসেম্বর মাসে (এবছর ১৯ ডিসেম্বর তারিখে) চূড়ান্তভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে। যাইহোক,প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার জন্য দরকার ২৬৯টির বেশিইলেক্টরাল ভোট। ৮ নভেম্বরের নির্বাচনে যে যে প্রার্থী পপুলার ভোটেযেসব রাজ্যে বিজয়ী হয়েছে সেইসব রাজ্যের ইলেক্টরাল ভোট সেই সেইপ্রার্থী পেয়েছে। সেই হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প টেক্সাস, ফ্লোরিডা, ইত্যাদিরাজ্যসহ ৩০টি রাজ্যের ৩০৬টি ইলেক্টরাল ভোট পেয়ে নির্বাচিতহয়েছে। পক্ষান্তরে হিলারি ক্লিন্টন কালিফোর্নিয়া, নিউইয়র্ক, ইত্যাদিরাজ্যসহ বাকী ২০টি রাজ্যের ২২৯টি ও ওয়াশিংটন ডিসির ৩টিসহমোট ২৩২টি ইলেক্টরাল ভোট পেয়েছে। যদিও, সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী সবগুলি রাজ্য থেকে প্রাপ্ত সর্বমোট পপুলার ভোটের হিসেবে হিলারিক্লিন্টন পেয়েছে ৬৫.৯ মিলিয়ন ভোট (৪৮.৫%), পক্ষান্তরে ট্রাম্পপেয়েছে ৬৩.০ মিলিয়ন ভোট (৪৬.৪%), অর্থাৎ, হিলারি ক্লিন্টনট্রাম্পের চেয়ে, ২.৯ মিলিয়ন (২.১%) পপুলার ভোট বেশি পেয়েছে।

আমেরিকার নির্বাচনে পপুলার (সত্যিকার জনগনের) ও ইলেক্টরাল(রাজ্যভিত্তিক) ভোটের এই গোলক ধাঁধাঁটি বেশ কৌতুহলুদ্দীপক এবংঅনেকের কাছে বিভ্রান্তিকরও বটে। ব্যক্তিগতভাবে, পপুলার ভোট এবং ইলেক্টরাল ভোটের এই অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তির ব্যাপারটি আমার কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট হয়েছিল ২০০০ সালের নির্বাচনে, যখন ডেমোক্রাট প্রার্থী আল গোর পাঁচ লক্ষাধিক (অর্ধ মিলিয়ন) পপুলার ভোট বেশীপেয়ে, শুধুমাত্র ইলেক্টরাল ভোটের (মাত্র একটি রাজ্য ফ্লোরিডার জন্য নির্ধারিত ২৫টি ইলেক্টরাল ভোট) ব্যবধানে রিপাবলিকান প্রার্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের কাছে অবশেষে হেরে গিয়েছিল। সেইবার, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের কারনে একমাত্র ফ্লোরিডা রাজ্যে চূড়ান্তভাবে পপুলার ভোটে বিজয়ী প্রার্থীর ফলাফল জানা বাকী ছিল, যখন পর্যন্ত বাকী সব রাজ্যের ইলেক্টরাল ভোটের ফলাফলে বুশ পেয়েছিল ২৪৬টি ভোট এবং আল গোর পেয়েছিল ২৬৭ ভোট (প্রয়োজন ছিল ২৭০ ভোটের)। কিন্তু ফ্লোরিডা রাজ্যের পপুলার ভোটের পুনঃগননার চূড়ান্ত হিসেবে শেষ পর্যন্ত মাত্র ৩২৭টি পপুলার ভোটের ব্যবধানে বুশ ঐরাজ্যে জয়ী হয়ে ইহার ২৫টি ইলেক্টরাল ভোট কব্জা করে মাত্র ২টি ইলেক্টরাল ভোটের ব্যবধানে ২৭১টি ইলেক্টরাল ভোট পেয়ে অনেকটা নাটকীয়ভাবে জয়ী হয়ে গিয়েছিল (যদিও সর্বমোট পপুলার ভোটের হিসেবে আল গোর বুশের চেয়ে অর্ধ মিলিয়নেরও বেশি ভোট পেয়েছিল)। উল্লেখ্য, ২০০০ সালের আগে একই ধরনের পরিস্থিতি আরো ২ বার সৃষ্টি হয়েছিল অনেক আগে – ১৮২৪ ও ১৮৭৬ সালে।

কিন্তু, পপুলার ভোটের এত বিশাল ব্যবধানে (প্রায় ২.৯ মিলিয়ন অর্থাৎ ২৯ লাখ) জয়ী হয়েও ইলেক্টরাল ভোটে হেরে যাওয়া এই প্রথমঘটল, যা আমেরিকা ও বিশ্বব্যাপী হিলারী সমর্থকদের প্রচন্ডভাবে হতাশ করেছে। উদাহরনস্বরুপ, কালিফোর্নিয়া এবং নিউ ইয়র্কের মত বড় রাজ্যগুলিতে হিলারি বিশাল পপুলার ভোটের ব্যবধানে জিতেছে(উল্লেখ্য, এই রাজ্যগুলিতে শ্বেতাংগদের তুলানায় হিস্পানিক এবংঅন্যান্য অভিবাসীদের বসবাস তুলনামূলকভাবে বেশি)। যেমন, জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় রাজ্য কালিফোর্নি রাজ্যে হিলারিট্রাম্পের চেয়ে ৪.৩ মিলিয়ন পপুলার ভোটে জিতেছে (হিলারি ৮.৮মিলিয়ন এবং ট্রাম্প ৪.৫ মিলিয়ন - ইলেক্টরাল ভোট ৫৫টি)।অন্যদিকে, হিলারি এবং ট্রাম্প দু’জনই নিউইয়র্কের অধিবাসী, কিন্তুহিলারি এই রাজ্যে ১.৮ মিলিয়ন বেশি পপুলার ভোটে জয়ী হয়েছে(হিলারি ৪.৬ মিলিয়ন এবং ট্রাম্প ২.৮ মিলিয়ন - ইলেক্টরাল ভোট ২৯টি)। পক্ষান্তরে, বড় রাজ্য গুলির মধ্যে একমাত্র টেক্সাস রাজ্যেহিলারির চেয়ে ট্রাম্প 0.8 মিলিয়ন পপুলার ভোটের বড় ব্যবধানেজিতেছে (ট্রাম্প ৪.৭ মিলিয়ন এবং হিলারি ৩.৯ মিলিয়ন - ইলেক্টরাল ভোট ৩৮টি) এবং ফ্লোরিডা রাজ্যে ট্রাম্প হিলারির চেয়ে মাত্র ০.১ মিলিয়ন (১ লাখ) ভোটের ব্যবধানে জিতেছে (ট্রাম্প ৪.৬ মিলিয়ন, হিলারি ৪.৫ মিলিয়ন - ইলেক্টরাল ভোট ২৯টি)। কিন্তু, হিলারির প্রাপ্তসর্বমোট পপুলার ভোটের এত বিশাল ব্যবধানের হিসেব নিকেষকেছাপিয়ে মাত্র তিনটি তুলনামূলকভাবে ছোট ব্যাটেলগ্রাউন্ড/মার্জিনালরাজ্যগুলিতে স্বল্প পপুলার ভোটের ব্যবধানে জিতে ট্রাম্প ঐ ৩টিরাজ্যের ৪৬টি ইলেক্টরাল ভোট (পেন্সিলভ্যানিয়া-২০, মিশিগান-১৬এবং উইস্কনসিন-১০) জিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত জয়ের মালাছিনিয়ে নিয়েছে। ঐ ৩টি রাজ্যে ট্রাম্প হিলারির চেয়ে মাত্র ৮৮ হাজারপপুলার ভোটের ব্যবধানে জিতেছে (পেন্সিল্ভ্যানিয়া ৪৪,০০০, মিশিগান১১,০০০ এবং উইস্কন্সিন ২৩,০০০ ভোট)। আর এখানেই ছিলনির্বাচনী প্রচারনার সূক্ষ্ম কৌশল খাটিয়ে ট্রাম্পের জেতার মোক্ষমঅস্ত্রটি। দেখা যায়, কালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্কের মত বড় রাজ্যগুলিতে জয়ের সুবাদে হিলারির ২.৯ মিলিয়ন (২৯ লাখ) পপুলার ভোট বেশি পাওয়ার বিপরীতে তুলনামূলকভাবে ৩টি ছোট রাজ্য –পেন্সিল্ভ্যানিয়া, মিশিগান ও উইস্কন্সিন – ট্রাম্পের মাত্র ৮৮,০০০ ভোটের ব্যবধানে জেতাটাই হয়েছে এই নির্বাচনে হার-জিতের ডিসাইসিভ ফাক্টর (decisive factor)। আর পপুলার ভোটের এইব্যবধান আনুপাতিক হারে বিচার করতে গেলে বলা যায়ঃ ৩০ : ১।

কিছুই করার নেই। পপুলার ভোটের চেয়ে ইলেক্টরাল ভোটে জিতে যাওয়াটাই আমেরিকার সংবিধানে লিপিবদ্ধ এবং আইনীভাবে সঠিক। কিন্তু, এটা আমেরিকার সংবিধানের ত্রুটি কিনা যা পরবর্তিতে কোন গভীর সংকটের সৃষ্টি করতে পারে এবং সেই বিবেচনায় কোন সংশোধনের প্রয়োজন আছে কিনা সেটা বিবেচনা/বিচার করার ভার আমেরিকান জনগনের হাতে। তবে এধরনের এই প্রশ্নটি আগের চেয়ে অনেকটা বেশী সামনে চলে এসেছে এই প্রথম এবং এবারের নির্বাচন নিঃসন্দেহে এই বিষয়টি নিয়ে অনেকের মনের অতীতের এই হালকা প্রশ্নটিকে অনেকটা গভীরে নিয়ে গেছে বোধ করি, যার প্রমান নির্বানোত্তর সারা আমেরিকাব্যাপী (এমনকি বহির্বিশ্বেও) উত্তাল বিক্ষোভ, যা ছিল আমেরিকার ইতিহাসে নজিরবিহীন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচিত হওয়াটা এক্ষেত্রে একটি বাড়তি বিবেচ্য বিষয় হয়তো, কারন শুধুমাত্র আমেরিকা নয় সারা পৃথিবীর ভূ-রাজনৈতিক ওঅর্থনৈতিক মানচিত্রে (geo-political & economic map) অনেকপরিবর্তন ও ঝুঁকির ইঙ্গিতবহ বলে মনে হচ্ছে বিষয়টি। একমাত্রভবিষ্যতই বলতে পারে! আরো একটি মজার ব্যাপার হল, সমর্থনেরদিক থেকে রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে (যেটি রাজ্য হিসেবে গন্য নয়) সবসময়ই ডেমোক্রাটদের প্রাধান্য যেখানে রিপাবলিকানদের পপুলার ভোটের হার সবচেয়ে কম। এখানে হিলারি পেয়েছে ২৬০,০০০ভোট (৯২.৮%) এবং ট্রাম্প মাত্র ১১,০০০ (৪.১%)। আরজনসমর্থনের এই দুর্বলতম স্থান থেকেই স্বেচ্ছাচারী, চরম দাম্ভিক, মিথ্যাচারকারী ও হঠকারী ডোনাল্ড ট্রাম্প তার (গোয়েবলস ষ্টাইলের) কেবিনেট সদস্যদের নিয়ে অন্ততঃপক্ষে আগামী ৪টি বছর লম্ফ-জম্ফ, হুমকি-দমকি, হুঙ্কার-গর্জন করে ও ছড়ি ঘুরিয়ে শুধুমাত্রআমেরিকাকেই শাসন করবেনা, বাকী পৃথিবীকেও বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠি প্রদর্শনকরে যাবে।

ব্যাটেলগ্রাউন্ড অথবা সুইং ষ্টেটসঃ অষ্ট্রেলিয়াতে যেমনটি লেবারপার্টি এবং লিবারাল/ন্যাশনাল কোয়ালিশন জয়ের জন্য নির্বাচনীকৌশল হিসেবে মার্জিনাল সিটগুলিকে টার্গেট করে, আমেরিকাতেতেমনি টার্গেট করা হয় তাদের ভাষায় ব্যাটেল্গ্রাউন্ড কিংবা সুইং(battleground or swing) ষ্টেটগুলিকে, যে রাজ্যগুলিতে প্রতিদ্বন্দী দুইবড় দলের সম্ভাব্য প্রাপ্য ভোটের ব্যবধান কম থাকে এবং ভোটারদেরসমর্থনে কিছুটা ভগ্নাংশ অথবা কয়েক শতাংশ সুইং কিংবা ব্যত্যয়হলেই ঐসব রাজ্যগুলিতে জয় পরাজয়ের ফলাফল পাল্টে যায় এবংইলেক্টরাল ভোটগুলি প্রতিদ্বন্দী দলের পক্ষে চলে যায়। সেদিক থেকেনির্বাচনী জরীপগুলির পূর্বাভাস অনুযায়ী এবারের নির্বাচনে প্রথমদিকে মূলতঃ তিনটি রাজ্যকে ব্যাটেল্গ্রাউন্ড কিংবা সুইং ষ্টেট হিসেবেমনে করা হয়েছিল – ফ্লোরিডা, নর্থ ক্যারোলিনা এবং ওহাইও, যেগুলিতে যে প্রার্থী জয় পাবে, সে-ই ইলেক্টরাল ভোটের ২৭০ ম্যাজিকনম্বরটি অতিক্রম করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবে। কিন্তু, জরীপগুলিরপূর্বাভাসকে উল্টে দিয়ে বাস্তবে নির্বাচনের দিন দেখা গেল উপরোক্ত৩টি ছাড়াও প্বার্শবর্তি আরো ৩টি রাজ্যে – পেন্সিল্ভ্যানিয়া, মিশিগান ওউইস্কনসিন – হিলারির বিপক্ষে সুইং হয়ে ট্রাম্পের জয়কে আরো সহজকরে দিয়েছিল। এখানেই ছিল ট্রাম্পের সঠিক নির্বাচনি কৌশল নিয়েঐ রাজ্যগুলির ক্ষুদ্ধ ভোটারদের মন জয় করা ও জয়ী হওয়ার চাবি-কাঠি।

কথিত রাস্ট বেল্টে (Rust Belt) শ্বেতাংগ ওয়ার্কিং ক্লাস ভোটারদেরএক নীরব বিপ্লবঃ
‘রাস্ট বেল্ট’ অর্থাৎ ‘মরিচা ধরে যাওয়া এলাকা’ কথাটির উৎপত্তি ৮০-র দশকের পরে এবং এটি বলতে বুঝানো হয় আমেরিকার উত্তর-পূর্ব থেকে মধ্য-পশ্চিম অঞ্চলের একটি বিশাল এলাকা নিউ ইয়র্করাজ্য থেকে শুরু করে পশ্চিমে পেন্সিল্ভ্যানিয়া, ওয়েষ্ট ভার্জিনিয়া, ওহাইও, মিশিগান, ইন্ডিয়ানা, ইলিনয়, উইস্কনসিন ও আইওয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। ৮০-র দশকের পূর্বে এই এলাকাটি ছিল আমেরিকার ইন্ডাষ্ট্রিয়াল বা ম্যানুফ্যাকচারিং বেল্ট নামে পরিচিত, যা ছিল আমেরিকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। বলা হয়, বিশেষ করে ১৯৯৪ সালে সম্পাদিত আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোরমধ্যে NAFTA (North American Free Trade Agreement) চুক্তিরকারনে বিশেষ করে মেক্সিকো ও কানাডা থেকে তুলনামূলকভাবে সস্তাপন্য-সামগ্রী আমদানীর কারণে গত ২/৩ দশকে এই অঞ্চলের অনেক ইন্ডাষ্ট্রি ও ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে পরিত্যক্ত হয়ে ‘মরীচা’ ধরে গেছে। ফলতঃ প্রচুর বেকার সমস্যার সৃষ্টি করে অত্র অঞ্চলের জন্য অর্থনৈতিক মন্দা ডেকে এনেছে এবং এই বেকার জনগোষ্ঠিকে অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ে বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য এক কঠিন সংগ্রামের সম্মুখীন হতে হয়েছে। আর ইদানিংকালে মাত্র ২০১৬ সালে সম্পাদিত প্যাসিফিক অঞ্চলের ১২টি রাষ্ট্রের মধ্যে TPP (Trans-Pacific Partnership) চুক্তির কারনে এই পরিস্থিতি আরো ঘোরতরহবার উপক্রম হয়েছে, যদিও চুক্তিটি এখনো আমেরিকা-কতৃক ratified হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচারনার উপদেষ্টারা রাস্ট বেল্টের বেকার জনগোষ্ঠির এই সেন্টিমেন্ট-টি সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিল এবং ‘কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনার’ বিষয়টিকে তাদের নির্বাচনী প্রচারনার অন্যতম পূঁজি হিসেবে ব্যবহার করে অত্র অঞ্চলের প্রান্তিক ভোটারদের মন জয় করতে পেরেছিল। তাইতো বিশেষ করে রাস্ট বেল্টের ক্ষুদ্ধ কট্টর শ্বেতাংগ বেকার ওয়ার্কিং ক্লাসের জন্য ট্রাম্পের প্রচারনার অন্যতম মূল আশ্বাস ছিল ক্ষমতায় গিয়েই NAFTA ওTPP চুক্তি বাতিল করবে এবং বেকারদের চাকুরি ফিরিয়ে আনবে। সেইসাথে যুক্ত হয়েছিল তাদের “Make America Great Again”, নামকশ্লোগানটি যাও তাদের আকৃষ্ট করেছে। এরই ফলশ্রুতি, একমাত্রনিউইয়র্ক, ইলিনয় ও মিনেসোটা ছাড়া রাস্ট বেল্টের অন্য সব রাজ্যেট্রাম্পের চমকপ্রদ বিজয়, যাকিনা তার চূড়ান্ত বিজয়কেও নিশ্চিতকরেছে। বিশেষ করে, যে পেন্সিল্ভ্যানিয়া রাজ্যে গত ৪/৫ বারের নির্বাচনে ডেমোক্রাটরা একটানা জিতেছে, সেখানে এবারে হেরে তারা রীতিমত হতবাক। প্রান্তিক ভোটারদের এই ক্ষুদ্ধ অনুভূতিটি বুঝতে না পারাটা ছিল বলতে হবে হিলারি ও তার প্রচারনা উপদেষ্টাদের এক চরম ব্যর্থতা বৈকি।

রুরাল (গ্রামাঞ্চল) – আরবান (শহরাঞ্চল) ডিভাইডঃ অষ্ট্রেলিয়াতেওনির্বাচনে যেমন শহরের এবং প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের ভোটারদের মধ্যেএকটি বিভাজন দৃশ্যমান, আমেরিকাতেও সেটি বর্তমান। যেমন, আমেরিকার প্রত্যন্ত মধ্যাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে সাধারনতঃরিপাবলিকান (red) ষ্টেট হিসেবে পরিগনিত, মূলতঃ এই কারনে যে, ঐরাজ্যগুলি তুলনামূলকভাবে কম শিক্ষিত শ্বেতাংগ (নিম্ন আয়ের চাষাও শ্রমিক শ্রেনী) অধ্যুষিত যাদের বেশির ভাগই কট্টরপন্থী আমেরিকানজাতীয়তাবাদী ধারনা দিয়ে প্রভাবিত এবং যাদের অনেকের কাছেআমেরিকার বাইরেও যে একটি পৃথীবি আছে তা অনেকটা অজ্ঞাতকিংবা বাস্তবে ততটা দেখেওনি। সুতরাং তাদের কাছে ট্রাম্প-মার্কা উগ্রজাতীয়তাবাদী কিংবা এন্টি-মাইগ্রান্ট শ্লোগানই বেশি দৃষ্টি আকর্ষনকরেছে। রাস্ট বেল্টের রাজ্যগুলি এবং টেক্সাস, ফ্লোরিডা, ইত্যাদিরাজ্যগুলির গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলেও একই অবস্থা। যতটা জানা যায়, ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে ঐ প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের শ্বেতাংগরা বেশিরভাগই গোড়া ক্যাথলিক খ্রিষ্টান, যাদেরকে প্রকারান্তরে বলা যায়খ্রিষ্টানদের মৌলবাদি অংশ। এদের মোটামুটি একটি অংশ আছে যারাইভাঞ্জেলিষ্ট (evangelist) হিসেবে খ্যাত, যারা খ্রিষ্টান ধর্ম চর্চার বাইরেইহার প্রচারেও বেশ স্বচেষ্ট এবং শোনা যায় এই গ্রুপটি ট্রাম্পেরপ্রচারনার একটি সরব ও আক্রমনাত্মক ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছিল।উল্লেখ্য, ক্যাথলিক খ্রিষ্টানরা এতই গোড়া যে তারা গর্ভপাতের প্রচন্ডবিরোধী এবং হিলারির গর্ভপাত সংক্রান্ত উদারনৈতিক বক্তব্যের এরাপ্রচন্ডভাবে বিরোধীতা করেছে এবং ট্রাম্প (নিজে বিশ্বাস না করলেও) তাদের সুরে সুর মিলিয়েছে স্রেফ তার ভোটের পাল্লা ভারী করার জন্য।সে দৃষ্টিকোন থেকে মুসলিম মৌলবাদের প্রতিপক্ষে একধরনের খ্রিষ্টীয়মৌলবাদের উত্থান যে আমেরিকাতেও ইতিপূর্বে শুরু হয়ে গিয়েছে এবং ক্রমবর্ধমান হারে বেড়ে চলেছে, সেটা এবারের নির্বাচনে স্পষ্টই দৃশ্যমান ছিল। অষ্ট্রেলিয়াতেও ইদানিংকালে দ্বারে দ্বারে ঘুরে খ্রিষ্টধর্মপ্রচারের প্রবনতা লক্ষ্য করা যায়, যারা বিনামূল্যে ধর্মীয় পুস্তিকা বিলিকরে বেড়ায়। আর আমেরিকার ট্রাম্প-পরবর্তি পরিস্থিতির backlash হিসেবে ইদানীং অষ্ট্রেলিয়ায় জনমত জরীপে পলিন হ্যান্সনের ওয়াননেশন পার্টির পুনরুত্থান দৃশ্যমান, লিবারেল কোয়ালিশনেরকট্টরপন্থীদের সাপোর্ট নিয়ে। এ বিষয়গুলি গভীর বিশ্লেষনের দাবিদার।

এজাতীয় কিছু কিছু বিষয় আমরা বাস্তবে প্রত্যক্ষ্য করেছি জুন-জুলাইমাসে আমদের আমেরিকা ভ্রমনের সময় যখন আমরা ওয়েষ্টভার্জিনিয়াতে ছোট ভাইয়ের ওখানে বেড়িয়েছি। ওদের কাছ থেকেশুনেছি, ঐ অঞ্চলের লোকদের আমেরিকার বাইরের জগৎ সম্পর্কেধারনা খুবই অস্পষ্ট ও অগভীর, যাদের অনেকেই আমেরিকারবাইরেতো দূরের কথা, এমনকি নিউইয়র্ক কিংবা ওয়াশিংটন পর্যন্তদেখেনি। আমরা যখন ওয়েষ্ট ভার্জিনিয়া থেকে নিউইয়র্কে ফিরছিলামতখন প্লেনে আমার স্ত্রীর তার পাশে বসা নর্থ ক্যারোলিনার এক ২৫বছরের তরুনীর কাছ থেকে শুনেছিল ওটা ছিল তার প্রথম নিউইয়র্কভ্রমন যেকারনে সে একটু শঙ্কিতও ছিল অত বড় শহরে প্রথম ভ্রমননিয়ে। একবার এক অষ্ট্রেলিয়ান মহিলার কাছ থেকে শুনেছিলাম তারআমেরিকার মধ্য অঞ্চলের একটি রাজ্য ভ্রমনের অভীজ্ঞতার কথা – মহিলা দুঃখ করে বলছিল ঐ প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক আমেরিকানদেরঅষ্ট্রেলিয়া এবং ইহার মূদ্রা ডলার সম্পর্কে অজ্ঞতার কথা! আমাদেরবাংলাদেশতো দূরের কথা! স্বভাবতঃই ঐসব অঞ্চলে ট্রাম্পের মতকট্টর রিপাবলিকান প্রার্থীরই আবেদন ছিল বেশি। আমেরিকারমধ্যাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে (red states) কোন ডেমোক্রাট প্রার্থীর জিতেআসাটা খুবই বিরল। পক্ষান্তরে, নিউইয়র্কসহ পূর্ব উপকূলীয়রাজ্যগুলিতে এবং কালিফোর্নিয়াসহ পশ্চিম উপকূলীয় রাজ্যগুলিতে(blue states) সর্বদাই ডোমোক্রাটদের প্রাধান্য মূলতঃ শিক্ষিতশ্বেতাংগ ও অভিবাসীদের সংখ্যার আধিক্যের কারনে। আর আমাদের ভ্রমনের সময়, ট্যুরিষ্ট হলেও ঐ স্বল্প সময়ে আমাদের বুঝতে কষ্ট হয়নি শ্বেতাংগ আমেরিকানদের মাঝে আমাদেরকে আমাদের গ্রহনযোগ্যতা কতটা নীচে। বিশেষ করে মনে পড়ছে, কানাডা থেকে ওয়েষ্ট ভার্জিনিয়া ফেরার পথে সারাদিনের ভ্রমনের পরে রাত ২টার সময় অবসাদগ্রস্ত অবস্থায় যখন পেন্সিল্ভ্যানিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রোভ শহরের একটি হোটেলে রাত কাটানোর জন্য পৌঁছেছিলাম, বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছিলাম রিসেপশনিষ্ট মেয়েটির মুখে তেমন কোন স্বাগতঃ ভাষনের সৌজন্যতার অভাব ও অনুপস্থিতি।

মুসলিম অভিবাসী ফ্যাক্টরঃ স্পর্শকাতর এই কার্ডটি ডোনাল্ড ট্রাম্পখেলেছিল ভালঅভাবেই এবং দক্ষতার সাথে। রিপাবলিকান বুশপ্রশাসনের আমলে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ওসামা বিনলাদেনের আল-কায়েদার সেই ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমেআমেরিকার গৌরব বলে খ্যাত নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পরেবিশেষ করে শ্বেতাংগ আমেরিকানদের মধ্যে মুসলুমান অভিবাসীদেরপ্রতি ঘৃনা ও বিদ্বেষ স্বভাবতঃই চরম আকার ধারন করেছিল। বুশপ্রশাসন ব্যর্থ হলেও ওবামা প্রশাসন বিন লাদেনকে পাকড়াও করেধ্বংস করতে পারলেও, পরবর্তিতে একই ধরনের আরো ছোট-বড়অনেক হামলা মুসলমানদের প্রতি শ্বেতাংগ আমেরিকানদের এইবিরূপ সেন্টিমেন্টকে উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই করেছে মাত্র। বিশেষ করেডেমোক্রাট ও রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাইমারিচলাকালীন সময়ে ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে নাইটক্লাবে ঢুকেআফগান যুবক ওমর মতিনের প্রায় ৩০জন লোককে হত্যা করানির্বাচনের পূর্বে শ্বেতাংগ আমেরিকানদের মনে আরো বিরূপপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এর আগে ঘটে যাওয়া ফ্রান্সে ও বেলজিয়ামেইসলামিক ষ্টেট (IS)-স্বীকৃত একাধিক সন্ত্রাসী হামলায় প্রচুর প্রানহানিমুসলমানদের প্রতি বিরূপ ধারনাকে প্রবল থেকে প্রবলতরই করেছে।গত কয়েকবছর ধরে সাদ্দাম হোসেন পরবর্তি ইরাকের উত্তরাঞ্চলে এবংবাশার আল আসাদের সিরিয়ার বিদ্রোহি অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চলেসহসাই IS-এর অভ্যুদয় ও তাদের নৃশংস সহিংসতা ও প্রতিপক্ষকেহত্যযজ্ঞ সারা পৃথিবীতে মুসলমানদেরকে একটি সহিংস জাতি হিসেবেউপস্থাপন করেছে মাত্র। ট্রাম্প এই স্প্রর্শকাতর ইস্যুটিকে পূঁজি করেআরো মুসলমান অভিবাসীদের আমেরিকা আগমনের উপরনিষেধজ্ঞা আরোপ এবং অবৈধ ও অপরাধী অভিবাসীদের আমেরিকাথেকে বের করে দেওয়ার বিষয়গুলিকে তার নির্বাচনী প্রচারনারএজেন্ডায় প্রাধান্য দিলে বিশেষ করে রুরাল (গ্রামাঞ্চল) আমেরিকা ওকথিত rust belt-এর (রিপাবলিকানদের ঘাটি) কট্টর বর্নবাদীশ্বেতাংগদের মাঝে এটির বেশ সাড়া মেলে, যা ঐ সমস্ত এলাকায়ট্রাম্পের ভোটের পাল্লা ভারী করেছে মাত্র।

উল্লেখ্য, সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আমেরিকায় মুসলমানদেরসংখ্যা মাত্র ০.৯% (ধরা যাক, ১%)। ধর্মবিশ্বাসের দিক থেকেআমেরিকায় ৭১% বিভিন্ন মত ও পথের খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বী, ৬% অন্যান্য ধর্মাবলম্বী (যার মধ্যে ১% মুসলমান, ২% ইহুদী, ১% হিন্দু, ১% বৌদ্ধ) এবং বাকী ২৩% কোন ধর্মে বিশ্বাসী নয় বলে ধরা হয়।কিন্তু, এই ১% মুসলমানরা আমেরিকা জন্য শংকা ও ঝুঁকির কারনহয়েছে, এটা বড় চিন্তা ও উদ্বেগের বিষয়। ঐতিহাসিকভাবে, এর প্রধানকারন হল, আমেরিকার প্রচন্ড ইহুদিপ্রীতি এবং মূলতঃ আরব বিশ্বের চরম অনৈক্যের সুযোগে আলাদা স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনে অনীহা। এছাড়া, আরব বিশ্বের স্বৈরাচারী অগনতান্ত্রিক শাসকদের উৎখাতের নামে ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, মিসর, ইত্যাদি দেশের রাজনীতিতে আমেরিকার জড়িয়ে পড়া, এবং পক্ষান্তরে সৌদি আরবসহ তেল সমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলির স্বৈরাচারী অগনতান্ত্রিক শাসকদের ক্ষমতায় টিকে থাকতে প্রচ্ছন্ন সহযোগিতা দেয়া, এসব কারণে আমেরিকার ব্যাপারে মুসলমানদের প্রচন্ড ক্ষোভ। এসব কারনে সৃষ্টি হয়েছিল, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সহায়তায় রাশিয়াকে হটানোর সময় আমেরিকার প্রচ্ছন্ন সমর্থনে ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়েদা এবং মোল্লা ওমরের তালেবান নামক উগ্র সন্ত্রাসবাদী সংগঠন। এরাই পরবর্তিতে বুমেরাং হয়ে চালিয়েছিল খোদ আমেরিকার উপর আক্রমন। এরপর, ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের অবর্তমানে সৃষ্ট ভ্যাকুয়ামের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে ইরাক ও সিরিয়ার ফাঁকা উত্তরাঞ্চলে আইএস-এর, যারা সারা বিশ্বে তাদের সন্ত্রাসী নেটোয়ার্ক গড়ে তুলতে সচেষ্ট। প্রশ্ন হল, এদের অস্ত্র সরবরাহ আসছে কোত্থেকে? অবশ্যই আমেরিকাসহ অন্যান্য উন্নত বিশ্বের দেশগুলি এবং রাশিয়া, চীন, ইত্যাদি দেশগুলি থেকেও। কারন, তা নাহলে তাদের যুদ্ধ অর্থনীতি(war economy) ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তাদের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ধসনামাবে। এখানে, অন্য যে দিকটি ভাববার বিষয় তাহল, মাত্র ১% অভিবাসী মুসলমানদের দ্বারা ‘আমেরিকায় ইসলাম প্রচার’ ও‘আমেরিকাকে ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিনত করা’ সম্পূর্নরূপে দুটিআলাদা বিষয়। অষ্ট্রেলিয়াতেও একই ধরনের পরিস্থিতির আলামতদৃশ্যমান।

খ্রীষ্টধর্মীয় উগ্রবাদ/মৌলবাদের উত্থানঃ এটি এবারের নির্বাচনেইস্পষ্টভাবে পরিলক্ষীত হয়েছে। স্বভাবতঃই আমেরিকার গ্রামাঞ্চলেরস্বল্পশিক্ষিত নিম্ন-আয়ের লোকদের মধ্যেই ধর্মীয় চেতনা ও বিশ্বাসবেশি কাজ করে, যা পৃথিবীর সব দেশেই পরিলক্ষিত। রুরালআমেরিকার (বিশেষ করে মধ্য-উত্তর আমেরিকার ‘রাস্ট বেল্ট’ নামেখ্যাত রাজ্যগুলি) গ্রামাঞ্চলের স্বল্পশক্ষিত কৃষক ও শ্রমিক শ্রেনীরজনগনের মধ্যে খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বি বেশি যারা অনেকটা কট্টরপন্থীএবং এদের মধ্যে রিপাবলিকান সমর্থক বেশি। খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বিদেরমধ্যে যথেষ্ট সেক্ট/গ্রুপ বিদ্যমান, যাদের মধ্যে evangelist নামকগ্রুপটি বেশ কট্টরপন্থি যাদের বেশিরভাগই (বিশেষভাবে শ্বেতাঙ্গরা) এবারের নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে বেশ সক্রিয় ও আক্রমনাত্মকভূমিকায় ছিল। বলা হয়, এই evangelist-দের সংখ্যা আমেরিকারজনসংখ্যার ২৫%। গনমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী এদের মধ্য সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাংগ evangelist-রা ট্রাম্পের মুসলিম বিরোধী এবং ‘আমেরিকাকেরক্ষা করো’ কিংবা ‘Make America Great Again’ এই প্রচারনারদ্বারা প্রভাবিত হয়েছে (যদিও ট্রাম্পের নিজস্ব ধর্মবিশ্বাসের ব্যাপারেসন্দেহ রয়েছে) যাদের ৮০% ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছে বলে ধরা হয়(যদিও সংখ্যালঘিষ্ঠ আফ্রো-এশিয়ান-হিস্পানিক evangelist-দেরভোট হিলারি বেশি পেয়েছে)। একারনে, নির্বাচনের রাতে CNN যখনভোটের ফলাফল ঘোষনা করছিল, তখন দেখা যাচ্ছিল কৃষক-শ্রমিকনিম্ন-মধ্যবিত্ত অধ্যুষিত রুরাল কেন্দ্রগুলির ফলাফলে ট্রাম্প এগিয়েযাচ্ছিল, পক্ষন্তরে, শিক্ষিত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত অধ্যুষিত শহরাঞ্চলের ফলাফল এসে তা পাল্টে দিচ্ছিল হিলারির পক্ষে।

বর্নবাদ (শ্বেতাংগ আমেরিকান নীতি)ঃ বিশেষ করে, বিন-লাদেনেরআল-কায়েদা কতৃক টুইন-টাওয়ার ধ্বংস পরবর্তি সন্ত্রাস দমন এবংঅর্থনৈতিক ক্ষেত্রে (১৯৩০ দশকের great depression-এর পরআমেরিকার ইতিহাসে ২০০৮ সালের সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক শেয়ারমার্কেট ধস) জর্জ বুশ প্রশাসনের চরম ব্যর্থতার প্রেক্ষিতে আমেরিকারজনগন ২০০৮ সালে একজন আফ্রো-আমেরিকান প্রেসিডেন্টনির্বাচিত করার পর মনে হয়েছিল আমেরিকায় বর্নবৈষম্যবাদ হয় প্রায়অবসান হয়েছে কিংবা একটি পরিপক্ক অবস্থানে পৌঁছেছে (অর্থাৎ, থাকলেও তেমনটি খোলামেলা ও দৃশ্যমান নয়)। কিন্তু, দীর্ঘ ৮ বছরেরদক্ষ ও যোগ্য বারাক ওবামার সফল প্রশাসনের পরেও দেখা গেলবর্নবৈষম্যবাদ আরো প্রচন্ড আকারে ফিরে এসেছে, অর্থাৎ একটি স্পষ্ট U-turn। মোদ্দা কথায়, একজন কৃষ্ণাংগ প্রেসিডেন্টের ৮ বছরেরশাসন অতি কষ্টে হজম করে এই বর্নবৈষম্যবাদী শ্বেতাংগ কট্টররিপাবলিকানরা তাদের চেতনায় আরো সংকীর্ন হয়ে আবারো মরিয়াহয়ে আবির্ভূত হয়েছে আরো জঘন্য ও ভয়ংকর মূর্তিতে। আরডোনাল্ড ট্রাম্প বিশেষ করে মুসলিম সন্ত্রাসবাদীদের অভিবাসনঠেকানো এবং অবৈধ অভিবাসী (বিশেষ করে হিস্পানিক) বহিস্কারেরনামে বর্নবৈষম্যবাদের এই কার্ডটি খুবই কৌশলে ও সুচারুভাবেখেলেছে, বিশেষ করে আমেরিকার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের কট্টর খ্রিষ্টানধর্মাবলম্বী (বিশেষ করে ইভাঞ্জেলিষ্টপন্থী), স্বল্প কিংবা অশিক্ষিত চাষা-ভূষাদের মধ্যে।

হিস্পানিক অভিবাসী ফ্যাক্টর এবং মেক্সিকোর সাথে ট্রাম্পেরপ্রস্তাবিত দেয়ালঃ মোদ্দাকথায়, যে সমস্ত দেশ ও জাতিসমূহ স্পেনেরসাবেক উপনিবেশ ছিল এবং স্পেনের সাথে ঐতিহাসিক যোগসূত্রআছে (যেমন, আমেরিকার দক্ষিনে মেক্সিকো এবং অন্যান্য মধ্যআমেরিকার দেশগুলি, পশ্চিম-দক্ষিনে কিউবাসহ অনেক ক্যারিবিয়ানদ্বীপ এবং আরো দক্ষিনে ব্রাজিলসহ দক্ষিন আমেরিকার অন্যান্যদেশগুলি), সেই সমস্ত দেশের লোকদেরকে বলা হয় হিস্পানিক(hispanic)। আমেরিকার দক্ষিন সীমান্তের পুরোটা জুড়ে মেক্সিকো, তাই প্রচুর সংখ্যায় মেক্সিকান আমেরিকায় অভিবাসী হয়েছে যাদেরবেশির ভাগ প্রধানতঃ মেক্সিকো সীমান্তবর্তি কালিফোর্নিয়া, আরিজোনা, নিউ মেক্সিকো ও টেক্সাস রাজ্যে বসতি গেড়েছে এবংসংখ্যার দিক থেকে ঐ রাজ্যগুলিতে শ্বেতাংগ আমেরিকানদের পরে এইহিস্পানিকদের অবস্থান। কিউবা ফ্লোরিডার খুব কাছে হওয়ায়, প্রচুরকিউবান হিস্পানিক প্রধানতঃ ফ্লোরিডায় অভিবাসী হয়েছে। আরমেক্সিকো দক্ষিন সীমান্তের পুরোটা জুড়ে থাকায় অন্যান্য দেশেরহিস্পানিকরা মেক্সিকোকে আমেরিকায় ঢোকার একটা gateway(প্রবেশপথ) হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। সর্বশেষ পরিসংখ্যানেহিস্পানিকরা আমেরিকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০%, আররাজ্যভিত্তিক হিসেবে কালিফোর্নিয়ায় ৩৮%, আরিজোনায় ৩০%, নিউ মেক্সিকোয় ৪৭%, টেক্সাসে ৩৮% এবং ফ্লোরিডায় ২৩%। এছাড়া, নিউইয়র্ক রাজ্যের জনসংখ্যারও প্রায় ২০% হিস্পানিক। অভিবাসনের ব্যাপারে উদারনৈতিক হওয়ায়, এই হিস্পানিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ডেমোক্রাট সমর্থক। আর এখানেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভয় এবং হিস্পানিকদের নিয়ে তার মাথাব্যথা যাদের সংখ্যা বিশেষ করে উপরোক্ত রাজ্যগুলিতে বেড়ে গিয়ে হিস্পানিকরা ভবিষ্যতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যেতে পারে এবং আমেরিকার demography-তেওভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি করতে পারে, এই শংকায়। একারনেই, হিস্পানিকরা অপরাধী, ড্রাগ ব্যবসায়ী, চোরাচালানী, এবং প্রচুর পরিমানে অবৈধভাবে অবস্থান করছে ও ঢুকে পড়ছে, ইত্যাদি অপবাদে অভিযুক্ত করে, এদের আরো অভিবাসন ঠেকাবার জন্য মেক্সিকোর সাথে দেয়াল স্থাপন করে এবং অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের ডিপোর্ট করার কথা বলে ট্রাম্প শিবির শ্বেতাংগ আমেরিকানদের মাঝে বেশ আবেদনের সৃষ্টি করতে পেরেছে। অধিকন্তু, নির্বাচনের আগে ট্রাম্প নিজে মেক্সিকো ভ্রমন করে মেক্সিকো সরকারকে রাজী করিয়ে এই প্রস্তাবিত দেয়ালের খরচ বহন করারও চেষ্টা করেছে, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে।

হিলারির ই-মেইল স্ক্যান্ডাল এবং FBI ডিরেক্টর জেমস কনিঃবলতেই হবে, এই ই-মেইল স্ক্যান্ডাল্টিই হিলারিকে সবচেয়ে বড়বেকায়দায় এবং বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল, যদিও FBI তদন্তেতেমন কিছু দোষের খুঁজে পায়নি এবং ই-মেইল ফাঁস হওয়ার ব্যাপারেহিলারি বিশেষ করে রাশিয়াকে হ্যাকিং করার দোষ দিয়েছে। ব্যাপারটিএখনো রহস্যজনক এবং অস্পষ্ট অনেকটা। কিন্তু অত বড় দায়িত্বশীলপদে থেকে ব্যক্তিগত সার্ভার থেকে রাষ্ট্রিয় গোপন/ক্লাসিফাইড ই-মেইলআদান-প্রদান করা অবশ্যই রাষ্ট্রিয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোন থেকেঝুঁকিপূর্ন এবং দায়িত্বহীনতার পর্যায়ের ছিল, এর পেছনে যতই যুক্তিদেখান হোকনা কেন এবং অতীতে পূর্বসুরীরা করেছিল এই যুক্তিতেপার পাবার চেষ্টা করা হোকনা কেন। ট্রাম্প ক্যাম্প প্রচারনায় এইস্পর্শকাতর বিষয়টিকে ক্রিমিনাল অফেন্স হিসেবে গন্য করে অন্যতমতুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করেছে। একদিকে ট্রাম্প তার বিভিন্নবক্তব্য ও বিতর্কে হিলারিকে জেলে নেয়ার কথাও বলেছে এবংঅন্যদিকে ট্রাম্প সমর্থকরা হিলারির বিরুদ্ধে ‘lock her up’ শ্লোগানদিয়েছে প্রতিনিয়ত। আর হিলারির এহেন বিব্রতকর পরিস্থিতির ফায়দাআখেরে ট্রাম্পের ঝুলিতেই গিয়েছে।

রহস্যাবৃত রাশিয়ার হ্যাকিং এবং ট্রাম্প-পুতিন সখ্যতাঃ আমেরিকা ও ইউরোপীয় বন্ধুরাষ্ট্রগুলিকে নিয়ে ন্যাটো জোটের চির শত্রু রাশিয়ার এবারের নির্বাচনকে নিয়ে প্রচন্ড আগ্রহ, ট্রাম্প ও তার সহযোগীদের সাথে ভ্লাদিমির পুতিন ও তার প্রশাসনের সাথে সখ্যতা, এবং রাশিয়া কতৃক হিলারি ক্লিন্টন ও তার ষ্টাফদের ই-মেইল হ্যাকিং করে গুরুত্বপূর্ন তথ্য ফাঁস করে দিয়ে নির্বাচনে প্রভাব ফেলা ও হিলারিকে বেকায়দায় ফেলা আগ্রহী মহলের মধ্যে বেশ কৌতুহলের সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে নির্বাচিত হলে সম্ভাব্য রুশ আক্রমনের প্রেক্ষিতে ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলিকে আমেরিকার সহযোগীতা ও প্রতিশ্রুতি থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পিছিয়ে আসার হুমকি এবং রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন বেশ বড় বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সোভিয়েত সাম্রাজ্য ভেংগে খান খান করে দিয়ে রাশিয়াকে তুলনামূলকভাবে দুর্বল করে দেয়ার পরে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে রাশিয়ার আসাদ সরকারের পক্ষে যুদ্ধে অবতীর্ন হয়ে আমেরিকার সাথে দীর্ঘ সংঘাতে জড়িয়ে পরা, এবং ইরানের নিউক্লিয়ার সক্ষমতা অর্জন সংক্রান্ত নেগোশিয়েসনে রাশিয়ার অনেকটা ইরানের পক্ষে অবস্থান নেয়ার প্রেক্ষিতে ট্রাম্প এবং পুতিনের মধ্যে এই সখ্যতার কারন খুবই রহস্যাবৃত যা বুঝতে হলে ট্রাম্পরাশিয়ার ব্যাপারে কিধরনের বাস্তব পদক্ষেপ নেয় সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এদিকে, বারাক ওবামা নির্বাচনে রাশিয়ার বিতর্কিত গোপন হ্যাকিং কর্মকান্ড পরিচালনার শাস্তি হিসেবে ক্ষমতা ছাড়ার ঠিক প্রাক্কালে রাশিয়ার ৩৫ জন কূটনীতিককে বহিষ্কার করার পরেও রাশিয়ার কোন পাল্টা পদক্ষেপ না নেয়াও বেশ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অধিকন্তু, ক্ষমতা ছাড়ার প্রাক্কালে বারাক ওবামা ইউরোপে ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলির সাথে একাত্ম হয়ে সম্ভাব্য কোন ধরনের রাশিয়ান হামলার আশংকায় আগাম (pre-emptive) পদক্ষেপহিসেবে পোলান্ডসহ কয়েকটি দেশে ৪০০০ আমেরিকান সৈন্যমোতায়েন করে গেছে, যে ব্যাপারে রাশিয়াও কোন মন্তব্য করেনি কিংবানয়া ট্রাম্প প্রশাসনও কিছু বলেনি এখন পর্যন্ত, যেটিও প্রশ্নের জন্মদিয়েছে। সুতরাং এসমস্ত প্রশ্নের জবাব পেতে হলে অপেক্ষা করা (wait-and-see) ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই আপাততঃ। তবে আপাতঃ বাহ্যিকদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, রাশিয়ার এনার্জি সম্পদ তেল-গ্যাসের মাধ্যমে সুবিধা নেয়াটা আমেরিকার অন্যতম বড় উদ্দেশ্য, যেকারণে বিখ্যাত আমেরিকান তেল কোম্পানী ExxonMobil-এর CEO রেক্সটিলারসনকে সেক্রেটারি অফ ষ্টেটস করা হয়েছে যার সাথে আছেপুতিনের অনেকদিনের ঘনিষ্ঠতা এবং যাকে কিনা পুতিন ২০১৩ সালেরাশিয়ার ‘Order of Frienship’ মেডালও প্রদান করেছে। তবেএকথাও মনে রাখা দরকার, কমিউনিষ্ট ওয়ার্ল্ড ধ্বংসের নামে ১৫টিষ্টেট-সম্বলিত বিশাল সোভিয়েত সাম্রাজ্যকে ও ইহার পূর্ব ইউরোপীয়বলয়টিকে disintegrate করে ছিন্ন-ভিন্ন করে দেয়ার রাশিয়ার গভীরক্ষতটি শুকিয়েছে কিনা সেটিও এক বিরাট প্রশ্নবোধক বিষয় বৈকি!

বহুলালোচিত বৃটেনের Brexit এবং ট্রাম্পের Brexit+++ঃনির্বাচনী ওয়াদার অংশ হিসেবে ট্রাম্প আমেরিকার খরচ বাচাবারজন্য ন্যাটো থেকে বেরিয়ে আসা, আমেরিকানদের হারানো চাকুরি/কাজ ফিরিয়ে আনার জন্য টিপিপি ও নাফটা চুক্তি বাতিল করাকেব্রেক্সিট+++ হিসেবে উল্লেখ করেছে। উল্লেখ্য, বিশ্বায়নের ধারনারপাশাপাশি সর্বশেষ ২৮টি ইউরোপীয় দেশ নিয়ে গঠিত ইউরোপীয়ইউনিয়ন (EU)-এর এক ও অভিন্ন আর্থ-রাজনৈতিক ইউরোপ গঠনেরদীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা শেষপর্যন্ত সফলতার মুখ দেখেছিল বিংশ শতাব্দীরশেষ এবং একুশ শতকের প্রথম দিকে, যার মাধ্যমে EU-ভুক্তদেশগুলির মধ্যেকার সীমান্ত উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং ঐসমস্তদেশগুলির নাগরিকরা বিনা ভিসায় একদিকে উত্তরে বৃটেন থেকেদক্ষিনে গ্রীস এবং অন্যদিকে পূর্বে পোলান্ড থেকে পশ্চিমে পর্তুগালপর্যন্ত ভ্রমন ও যাতায়াত সুগম করে দিয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক দিকথেকে যখন এক মূদ্রা (Euro) চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল তখনবাধ সেধেছিল বৃটিশরা, যারা তাদের ঐতিহ্যবাহী পাউন্ডকে বিলুপ্ত হতেদিতে রাজী হয়নি, যেকারনে একমাত্র বৃটেন ছাড়া বাকী ২৭টি দেশে‘ইউরো’ মূদ্রা হিসেবে চালু হয়েছে। এখান থেকেই BREXIT-এরসূত্রপাত বলা যায়। পরবর্তিতে ইইউ-ভুক্ত দেশগুলির কমন মার্কেটেবৃটিশ পন্যসামগ্রির তুললামুলক সুবিধা হারানোর প্রেক্ষিতেঅর্থনৈতিক ক্ষতির কারনে বৃটিশ জনগনের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়াদেখা দেয়। অন্যদিকে, ভিসামুক্ত ভ্রমন ও যাতায়াতের কারণে অন্যান্যইইউ-ভুক্ত দেশগুলি থেকে প্রচুর সংখ্যক লোক বৃটেনে এসে বসবাস শুরু করায় বৃটিশদের জনজীবনে এর অনেক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মূলতঃ এরই ফলশ্রুতিতে অনুষ্ঠিত হয় ব্রেক্সিট গনভোট, যাতে বৃটিশরা ব্রেক্সিটের পক্ষে রায় দিয়েছে। আর এটিই ট্রাম্পকে সাহস যুগিয়েছে TPP ও NAFTA চুক্তি বাতিল করে আমেরিকানদের চলেযাওয়া চাকুরি ফিরিয়ে আনার নাম করে। পক্ষান্তরে, বৃটেনের ইইউথেকে বেরিয়ে আসার ফলে আমেরিকারও সুবিধা হবে বৃটেন ও অন্যন্যদেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক চুক্তি সম্পাদন করা। অন্যদিকে, ট্রাম্পের জয় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কট্টরপন্থী রাজনৈতিক দলগুলিকে আশা জুগিয়েছে, বিশেষ করে জার্মানী, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসে, যেখানে মোটামুটি উদারপন্থীরা ক্ষমতাসীন আছেযাদের অভিবাসন নীতিও উদার। বিশেষ করে, ব্রেক্সিট-পরবর্তি বৃটেনে পরবর্তি নির্বাচনেও লেবার দল ক্ষমতাসীন হতে পারবে কিনা সেটি দেখার বিষয়, কারন ব্রেক্সিট রক্ষনশীল পন্থার বিজয়ের ইংগিতবহ যদিও লেবার দল মূলতঃ ব্রেক্সিটের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিল।

চীন ফ্যাক্টর – দীর্ঘ সাড়ে চার দশক পরে আমেরিকার ‘এক চীননীতি’-কে ট্রাম্পের চ্যালেঞ্জঃ বিষয়টির হোতা ছিল এক রিপাবলিকানপ্রেসিডেন্ট (রিচার্ড নিক্সন) এবং তার (বিখ্যাত কিংবা কুখ্যাত) বিদেশমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার সাড়ে ৪ দশক আগে সেই ১৯৭১ সালে, যখনরাশিয়ার সাথে আমেরিকার স্নায়ুযুদ্ধ ছিল চরমতম পর্যায়ে এবংকমিউনিষ্ট পৃথিবী ছিল রাশিয়ান ও চাইনিজ ব্লকে বিভক্ত। কমিউনিষ্টআদর্শ নিয়ে দু’টি ব্লকে ছিল প্রচন্ড বিভাজন, দ্বন্দ্ব ও বিভ্রান্তি যাররাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল আমেরিকা এবং মাও সেতুং-এর নেতৃত্বাধীন কমিউনিষ্ট চীনের (মূল ভূখন্ড – Peoples Republic of China - PRC) বন্ধুত্ব, মূলতঃ রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত বলয়ের তুলনায় আমেরিকা-সমর্থিত বলয়কে কৌশলগতভাবে (strategically) শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এবং প্রশান্ত মহাসাগরের সামরিক নেতৃত্বনিতে। পরিবর্তে আমেরিকাকে ত্যাগ করতে হয়েছিল দ্বিতীয়বিশ্বযুদ্ধকালীন মিত্র পূঁজিবাদী চীনা নেতা চিয়াং কাই শেক-এরRepublic of China(ROC) সরকারকে যারা ১৯৪৯ সালেরকমিউনিষ্ট বিপ্লবের পর তাইওয়ানে (মূল ভুখন্ড থেকে ১৫০ কিঃমিঃদূরে প্রাক্তন ফরমোজা দ্বীপ) পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল এবং ’৭১ সাল পর্যন্ত এই ‘তাইওয়ান’-ভিত্তিক চীন সরকারই স্বীকৃত ছিল আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে এবং জাতিসংঘে। ১৯৭১ সালেআমেরিকা তার পররাষ্ট্রনীতিতে বিশাল পরিবর্তন এনে কমুনিষ্ট চীনকে‘আসল’ চীন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নুতন করে ‘এক চীন নীতি’-রপ্রবর্তন করে। আর সেই থেকে সাড়ে ৪ দশক ধরে আমেরিকার ‘এক-চীন নীতি’ চলে আসছিল প্রায় নির্বিগ্নে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে, আজ সেই নীতিকে চ্যালেঞ্জ করেছে আরেক রিপাবলিকানপ্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, নির্বাচিত হবার পর তাইওয়ানেরপ্রেসিডেন্টের সাথে ফোনালাপ করে। স্পষ্টতঃইঃ চীন এটাকে চুক্তিরবরখেলাপ এবং মারাত্মক কূটনৈতিক লংঘন হিসেবে দেখছে, যারভবিষ্যত পরিনতি কি হবে তা আমেরিকা ও চীনের এসংক্রান্ত পরবর্তিপদক্ষেপের উপর নির্ভর করবে। সেইসাথে দক্ষিন চীন সাগরেরনিয়ন্ত্রনের ব্যাপারটিও সামনে চলে এসেছে। স্পষ্টতঃই, ট্রাম্পেররাশিয়ার সাথে সখ্যতা এবং এক-চীন নীতি থেকে বিচ্যুতি অত্রঅঞ্চলে একটি সংঘাতপূর্ন পরিস্থিতিরই ইঙ্গিতবহ। ইদানীংকালে, ব্যষ্টিক অর্থনীতির (macro-economy) আকারে চীনের অর্থনীতিরআমেরিকার অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে যাওয়াও আমেরিকার মাথা ব্যথারকারন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ট্রাম্প – এক লম্পট, নারী বিদ্বেষি এবং অসৎ চরিত্রেরনৈতিকতাবিহীন মতলববাজঃ “Grab them by p…y” – নারীদেরনিয়ে এই রকম জঘন্য উক্তি করেছে লম্পট চরিত্রের প্রচুর টাকারঅধিকারী রিয়াল এষ্টেট টাইকুন বিলিয়নিয়ার ডোনাল্ড ট্রাম্প, যেকিনা নির্বাচিত হয়েছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে আর যাকেকিনা মনে করা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী এক নম্বর ব্যক্তিহিসেবে! এটা নির্মম পরিহাস ছাড়া আর কি? এটা কোন গুজব নয়, মিডিয়া প্রমান সহকারে এ তথ্য হাজির করেছে। রিয়াল এষ্টেট ব্যবসায়উত্থানকালে টাকার গরমে তখন মূলতঃ সুন্দরী প্রতিযোগিতারললনাদের নিয়ে মনোরঞ্জনই ছিল ট্রাম্পের কাছে মুখ্য বিষয় এবং নারীতার কাছে ভোগের বস্তু ছাড়া আর কিছুই ছিলনা এবং এখনো নয়।মিথ্যাচারী ও নির্লজ্জ ট্রাম্প অবশ্য এসব অবলীলায় অস্বীকারওকরেছে। এমনি করেই বর্তমান ফার্ষ্ট লেডির আসন অলংকৃত করেছেতার ৩য় কিংবা ৪র্থ স্ত্রী ক্রোশিয়ার বংশোদ্ভূত মডেল মেলানিয়া, যেকিনা এসব ব্যাপারে তার স্বামীর পক্ষে সাফাই গেয়েছে। অভিযোগআছে, ট্রাম্প তার tax return জনসমক্ষে প্রকাশ না করার ব্যাপারে(যেটি জনগনের জানার অধিকার রয়েছে), কিন্তু তার আইনজীবিরপরামর্শ অনুযায়ী এটি করা থেকে বিরত রয়েছে আইনী বাধ্যবাধকতানেই এ দোহাই দিয়ে (যেটিকে দেশটির সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তির জন্যনৈতিক স্খলন বলতে হবে)। হায়রে আমেরিকার আইন! এই আইনেরফাঁক-ফোকর গলিয়ে তার ব্যবসায়িক জীবনে ট্রাম্পকে ৬বারের মত দেউলিয়াও ঘোষনা করতে হয়েছিল। চতুর ট্রাম্প এই সমস্ত চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বেরিয়ে এসেছে ঠিকই, কিন্তু সর্বসান্ত হয়েছে তার ব্যবসাগুলিতে জড়িত প্রচুর চাকুরিজীবি ও ছোট ছোট ব্যবসায়িরা।

ট্রাম্পের MAGA দর্শনঃ ‘Make America Great Again’ - শ্লোগানটির মধ্যে একটি নেতিবাচক কিন্তু উগ্রবাদী গন্ধ পাওয়া যায়এবং ট্রাম্প শিবিরের এক ধরনের হীনমন্যতাবোধ (inferiority complex) থেকে ইহার উদ্ভব বলে মনে হচ্ছে। কারন পৃথিবীর সবচেয়েশক্তিশালী ও উন্নত দেশ ও অর্থনীতি আমেরিকাতো great আছেই, কিন্তু তাকে এই শ্লোগানের মাধ্যমে ছোট করে দেখে আবার বড় করারনামে আমেরিকার কট্টরপন্থী বিপাবলিকান সমর্থকদের এবংগ্রামাঞ্চলের স্বল্পশিক্ষিত চাষা-ভূষা ভোটারদের মন জয় করার জন্যএটা ছিল ট্রাম্প শিবিরের একটি নির্বাচনী কৌশল ও বাগাড়ম্বর(rhetoric) মাত্র। আর সেটি প্রন্তিকভাবে হলেও কাজে লেগেছে ‘rust belt’ নামে খ্যাত কিছু তুলনামূলকভাবে ছোট ছোট রাজ্যে স্বল্পমার্জিনে পপুলার ভোটে জিতে ট্রাম্পের ঐ রাজ্যগুলির ইলেক্টরালভোটগুলি জিতে যাওয়ার মাধ্যমে।

অবশ্য, এর পেছনে একটি অর্থনৈতিক কারনও যে নিহিত আছেসেটিও অস্বীকার করা যায়না। এখানে আবারও ‘চীন ফ্যাক্টর’ (China factor) এসে যায়। সাম্প্রতিককালে (গত ২/৩ দশক ধরে), বিশ্ববাজারে বিশেষ করে সস্তা শ্রমের সুবাদে কম উৎপাদন খরচের সুবিধারজন্য চীনের পন্য সামগ্রীর তুলনামূলক সুবিধার (comparative advantage) কারণে চীনের বিশাল মাত্রার অভাবনীয় বাৎসরিকপ্রবৃদ্ধির হার (গড়ে ৭% থেকে ১০%+) তাকে পৃথীবির অন্যতমঅর্থনৈতিক শক্তিতে পরিনত করেছে গত ২/৩ দশক ধরে এবংবিস্ময়করভাবে আজ GDP (gross domestic product)-এর মাপকাঠিতে সামষ্টিক অর্থনীতির (macroeconomy) দিকে থেকেআকারে আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন, যা বিশেষ করে যারা বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনৈতিক খবরাখবর রাখেনতাদের সবারই মোটামুটি জানা, । সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬সালের মোট GDP (nominal)-এর হিসেবে আমেরিকার অর্থনীতিরআকার ১৮.৬ ট্রিলিয়ন ডলার (১ম) এবং চীনের ১১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার (২য়) এবং ২০২০ সালের পূর্বাভাসে আমেরিকার অর্থনীতিরআকার হবে ২১.৯ ট্রিলিয়ন এবং চীনের ১৬.৫ ট্রিলিয়ন। স্পষ্টতঃইদেখা যাচ্ছে, চীনের বিশাল প্রবৃদ্ধির সুবাদে ২০২০ সালে এসে GDP (nominal)-এর হিসেবে আমেরিকা ও চীনের অর্থনীতির ব্যবধানঅনেক কমে আসবে এবং চীনের এই প্রবৃদ্ধির হার চলমান থাকলেঅদূর ভবিষ্যতে এই ব্যবধান আরো কমে আসবে ধারনা করা হয়, কিংবা চীন আমেরিকাকে টপকেও যেতে পারে।

অন্যদিকে, GDP নির্নয়ের আরেকটি পদ্ধতি বিশ্ব অর্থনীতিতে বেশতাৎপর্যপূর্নভাবে আবির্ভূত হয়েছে, যা হয়েছে আমেরিকার জন্য মাথাব্যাথার ও অপমানেরও বটে। সামষ্টিক অর্থনীতির বিশ্লেষনে GDP নির্নয়ে বিকল্প একটি পদ্ধতিও চালু হয়েছে সাম্প্রতিককালে, যাকে বলাহয় GDP (PPP-purchasing power parity) পদ্ধতি। এখানেলক্ষ্যনীয় বিষয়টি হল, GDP (nominal) পদ্ধতিতে কোন একটিদেশের বছরে মোট উৎপাদিত পন্য-সামগ্রী (goods & services)-কে(আমেরিকান ডলারের সাথে চলমান বিনিময় হারের ভিত্তিতে) বাজারমূল্য (current price) দিয়ে গুনন করে মোট GDP হিসেব করা হয়।কিন্তু,, GDP (PPP) পদ্ধতিতে মোট উৎপাদিত পন্য-সামগ্রীকে বাজারমূল্যের পরিবর্তে সেই দেশের মূদ্রার চলমান ‘ক্রয়-ক্ষমতার সমতার’ (purchasing power parity) ভিত্তিতে গুনন করে হিসেব করা হয়।যেমন, ধরা যাক, চীনের মূদ্রা ইউয়ান (yuan) আমেরিকান ডলারেরতুলনায় কম মূল্যমানের হওয়ায়, কোন বিশেষ পন্য বা পন্য-সামগ্রীরগ্রুপ ডলারের সমমানের ইউয়ান দিয়ে বেশি ক্রয় করা যায় বলে, ডলারের বিপরীতে ইউয়ানের ক্রয় ক্ষমতার ইনডেক্স (index) অর্থাৎPPP/Nominal ratio বেশি যেক্ষেত্রে আমেরিকান ডলারেরPPP/Nominal ratio-কে একক ইউনিট (১) হিসেবে ধরা হয়। সেইহিসেবে ২০১৬ সালে ডলারের বিপরীতে চীনা ইউয়ানের ইনডেক্স ১.৮৬৭ এবং বাংলাদেশের বেলায় ২.৭৭১ (আর ভারতের বেলায় আরো বেশী ৩.৮৭৪)। সেই হিসেবে, ২০১৬ সালের PPP ইনডেক্স(১.৮৬৭) হিসেবে চীনের GDP (PPP) দাঁড়িয়েছে ২১.২৫ ট্রিলিয়ন ডলা্রে (১১.৪x1.867), কিন্তু আমেরিকার PPP/Nominal ratio একক ইউনিট বিধায় ইহার GDP(Nominal) এবং GDP(PPP) একইথেকে গেছে ১৮.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে। অতএব দেখা যাচ্ছে, ২০১৬ সালেসে GDP(Nominal)- হিসেবে আমেরিকা ১ম স্থানে থাকলেও, GDP(PPP)-র হিসেবে চীনের অর্থনীতি আকারে আমেরিকাকেটপকিয়ে ১ম স্থান অধিকার করেছে। আর ২০২০ সালের পূর্বাভাসঅনুযায়ী, GDP(Nominal)-এর হিসেবে আমেরিকার অর্থনীতিরআকার হবে ২১.৯ ট্রিলিয়ন (১ম) এবং চীনের ১৬.৫ ট্রিলিয়ন (২য়) এবং পক্ষান্তরে, GDP(PPP)-র হিসেবে হবে আমেরিকার অর্থনীতিরআকার হবে ২১.৯ ট্রিলিয়ন (২য়) এবং চীনের ২৯.৩ ট্রিলিয়ন (১ম)।

আর এখানেই স্পষ্টতঃই বোধ করি ট্রাম্পের মূল মাথা ব্যাথার কারনএবং ‘Make America Great Again’ শ্লোগানটির উৎপত্তিরপটভূমি। এখানে লক্ষ্যনীয় ব্যাপারগুলি হলঃ (১) ২০২০ সালেGDP(Nominal)-এর আকারে আমেরিকা ১ম স্থানে থাকলেও চীনেরসাথে ব্যবধান ক্রমান্বয়ে কমে আসছে এবং GDP(PPP)-র হিসেবে চীনপ্রথম স্থানে উঠে এসে আমেরিকার সাথে তার ব্যবধান আরো বেড়েছে, (২) ইহা এই ইংগিত দেয় যে, চীনের বর্তমান ক্রমবর্ধমানশীল প্রবৃদ্ধিরহার (৭% থেকে ১০%) চলমান থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ চীন GDP(Nominal) এবং GDP(PPP) উভয় পদ্ধতির হিসেবেআমেরিকাকে ছাড়িয়ে ১ম স্থানে চলে আসবে, এবং (৩) চীনের মূলচালিকা শক্তি তার ১.৩৭৬ বিলিয়ন (১,৩৭৬ মিলিয়ন) জনসংখ্যা যাআমেরিকার জনসংখ্যার (৩২৫ মিলিয়ন) চেয়ে প্রায় ৫ গুন বেশি।কিন্তু, এক্ষেত্রে আরো লক্ষ্যনীয় বিষয়টি হল, জনসংখ্যা প্রায় ৫ গুনবেশি হওয়ায়, চীনের মাথাপিছ আয় (per capita income) আমেরিকার চেয়ে অনেক কম - ২০১৬ সালের এষ্টিমেট অনুযায়ীআমেরিকার ৫৭,২০০ ডলারের বিপরীতে চীনের ৮,২০০ (GDP-nominal পদ্ধতিতে) এবং ১৫,১০০ (GDP-PPP পদ্ধতিতে)। অতএববলতে হবে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির (growth) মাপকাঠিতে শুধুমাত্রজনশক্তির জোরে চীন গত ২/৩ দশকে প্রচুর এগিয়ে গেলেও, সত্যিকারের অর্থনৈতিক উন্নয়নের (development) মাপকাঠিতে(যেখানে প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে আয়ের সুষম বন্টন এবং অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, সাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, ইত্যাদি বুনিয়াদিপ্রয়োজনের (basic needs) ভিত্তিতে জনগনের সার্বিক উন্নয়নওজড়িত) চীন আমেরিকা থেকে অনেক পিছিয়ে আছে এখনো।কিন্তুতাএখানে নিরেট বাস্তবটা হল চীন প্রচন্ড গতিতে এগিয়ে যাচ্ছেএবং অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতিতে ও রাজনীতিতে আমেরিকারপাশাপাশি নিজের অবস্থানকে ক্রমান্বয়ে পাকা-পোক্ত করছে।

সাম্প্রতিক