মোমিন মেহেদী
tista barage‘মমতা ব্যানার্জীর কথা শুনলে ঘৃণায় পিত্তি জ্বলে যায়। জাতি ও রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে খুব হীন মন্য বলে মনে হয়। তিনি তিস্তার পানি এবং বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলেন- ”জল দোবো কোত্থেকে ! তিস্তার জলে অনেক ঝামেলা আছে। আমরাইতো ব্যবহার করে সারতে পারছি না। বাংলাদেশের জন্য খুব খারাপ লাগে! ওরা বার বার জল চাইতে আসে কিন্তু দিতে পারি না। কোত্থেকে দোবো- তিস্তায় তো জলই নেই !’ সাবেক এমপি গোলাম মাওলা রনির মত আমার পিত্তি না জ্বললেও কষ্টের রাস্তা দেখে দেখে খেই হারিয়ে ফেলি।

হায়রে আমার বন্ধুদেশ, হায়রে আমার বান্ধবি! এই যদি হয় নদীগিরি, তাহলে আমাদের তো ইহ জীবনে নদী কেন্দ্রিক কষ্ট দূর হবে না। আর তার পেছনে নেপথ্য নায়িকা হিসেবে বন্ধুদেশ ভারতের রাজ্যপ্রধান মমতা বান্ধবি ভূমিকা পালন করেই যাবেন। তাহলে আর ভারতীয় বীর সেনানীদের সম্মাননা, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মোদির তিন ঘোষণা দিয়ে কি লাভ। দেশের মানুষকে মৃত্যুর মুখোমুখি রেখে আবেগে উচ্ছ্বাসে স্মৃতিকাতর মানেকশ সেন্টারকে স্মরণিয় করে কি হবে? কি হবে গাছের গোড়া কেটে উপরে পানি ঢালার মত করে এমন বক্তব্য দিয়ে ‘যে স্বপ্ন ভারতের জন্য দেখি, সেই শুভ কামনা বাংলাদেশের জন্যও’। বিশেষ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এমন বক্তব্য সত্যি-ই অবান্তর- মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আমাদের কিছু করা উচিত। তাই একটা ঘোষণা দিতে চাই।

বাংলাদেশের সব মুক্তিযোদ্ধার জন্য পাঁচ বছরের করে ভিসা দেয়া হবে। প্রতি বছর ১০০ জন করে মুক্তিযোদ্ধা বিনা খরচে ভারতে চিকিৎসা পাবেন। এছাড়া তাদের সন্তানদের বৃত্তি দেয়া হবে; বৃত্তির আওতায় পড়বেন ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।’ কেননা, বাংলাদেশের মানুষের যুগ-যুগান্তের চাওয়া তিস্তার হিস্যা। তা না করে যদি মোদি হাজার বারও বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের গৌরবের সঙ্গে যুক্ত বুদ্ধিজীবীদের ষড়যন্ত্র করে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। কেবল নির্দোষকে হত্যা নয়, বাংলাদেশের চেতনাকে শেকড় থেকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু জয় হয়েছিল মানবতার। মানবতার জন্য যারা আত্মবলিদান দিয়েছেন তাদের পরিবারকে বাংলাদেশ সম্মানিত করছে, তাই আজ বিশেষ দিন। বাংলাদেশে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা শহীদদের স্মরণের দিন। আজকের এই দিন ঐতিহাসিক বেশকিছু কারণে। সব ভারতীয় সৈন্যের পরিবারের জন্য এটা চিরদিন মনে রাখার মতো মুহূর্ত। বাংলাদেশ সেই সেনাদের স্মরণ করছে, যারা এই দেশটির স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছিল। ভারতের কোটি কোটি মানুষের পক্ষ থেকে তাই আমরা তাদের কৃতজ্ঞতা জানাই। আমার সৌভাগ্য, আজ সাত ভারতীয় শহীদ পরিবার এখানে উপস্থিত আছে। সারা ভারত আপনাদের ত্যাগের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছে। সব শহীদকে কোটি কোটি প্রণাম। বাংলাদেশের জন্মগাথা এক অসীম বলিদানের গাথা। ১৯৭১-এর পর শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অশান্তি থেকে বের হয়ে আসে। বাংলাদেশকে সোনার বাংলার স্বপ্নপূরণের রাস্তা দেখিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। আমি তার বিচারের জ্ঞানকে ধারণ করতে পেরেছি, এ আমার সৌভাগ্য।’ তাতে বাংলাদেশের মানুষের কিচ্ছুই যায় আসে না। কেননা, তারা চায় অধিকার, পানির অধিকার; চায় আমাদের রাজনৈতিক ক্ষমতাধরদের পেছন থেকে সরে গিয়ে স্বচ্ছ-নিরপেক্ষতায় ভূমিকা। যা না করে ভারত বারবার প্রমাণ করেছে যে, তারা কেবল স্বার্থ আদায়ের জন্যই যখন যে সরকার বাংলাদেশের ক্ষমতায় আরোহণ করেছে, তখন সেই সরকারের সহযোগিতাতেই দেশের বারোটা বাজানোর বাদ্যি বাজিয়েছে। যেভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-জাসদ-ওয়ার্কার্স পার্টির নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের ক্ষমতাকে দীর্ঘ মেয়াদী করার জন্য সহযোগিতার অযুহাতে তাদের সহযোগিতায় আমাদের মাটি-মানুষ ও পানির অধিকার হরণের মহাযজ্ঞ চলছে। সেই আনন্দে উল্লাসিত মোদি বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এখানে এসেছেন। আমি তার সাহসের প্রশংসা করি। যে মুশকিল পরিস্থিতি থেকে নিজেকে ও দেশকে বের করেছেন তিনি, সেই সাহস সবার থাকে না। কেউ ভাবতে পারে, পরিবারের ১৬ জন নিহত হওয়ার পরও বঙ্গবন্ধুকন্যা সোনার বাংলার স্বপ্নপূরণের চেষ্টা ধরে রেখেছেন। ৪৫ বছরে বাংলাদেশের জিডিপি বেড়েছে ৩১ গুণ। শিশুমৃত্যু ২২২ থেকে ২৯-এ নেমে গেছে। পরিবর্তনের এই ধারা বহু কিছু বলছে। শেখ হাসিনার হাত ধরে আর্থিক প্রগতির নতুন সীমা অতিক্রম করছে বাংলাদেশ। ভারতের বিকাশ একা একা অসম্পূর্ণ। আমরা ভাবতে পারি না, এই এলাকায় আমরা একা একা চলব। আমরা চাই, আমাদের আশপাশেও সুখ-শান্তি বিরাজ করবে। এজন্যই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক মজবুত আছে। যে স্বপ্ন আমি ভারতের জন্য দেখি, ওই শুভকামনাই আছে বাংলাদেশের জন্য। বন্ধু হওয়ার সুবাদে যতটা সহযোগিতা করতে পারে ভারত, সবই করা হবে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশ ও ভারতের মিল রয়েছে। মিলটি হল মানবিক বিষয়ে আমরা এক কাতারে। ১৯৭১ সালেও এক কাতারে ছিলাম। সে সময় একটি দেশ গণহত্যা চালিয়েছিল। সেক্ষেত্রে আমরা একই পথের পথিক। আমরা মানবিক বলেই ৯৫ হাজার পাকিস্তানি সেনাকে হারের পরও ছেড়ে দিয়েছি। পাকিস্তানকে ইঙ্গিত করে মোদি মন্তব্য করেন, ভারত-বাংলাদেশ যখন শান্তির জন্য কাজ করছে, তখন একটি বিশেষ দেশ সন্ত্রাসের জন্য কাজ করছে।’ এভাবে বাংলাদেশের অধিকার নষ্ট করে, নিজেদের সম্পদ পরের ঘরে দিয়ে ক্ষমতায় আসার আর থাকার চেষ্টা যারাই করেছে, তাদেরকেই প্রশংসা শুনিয়েছিলেন অতিতের ভারতপ্রধানগণ। আজ যখন নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী চুক্তি হচ্ছে তখন তারা খুশিতে কতই না প্রশংসা বাক্য শোনাচ্ছেন। আর তা শুনে নৃত্য করছেন আমাদের রাষ্ট্রনায়কসহ প্রায় সকলেই। এই সুযোগে গড়ে উঠছে ছাত্রশিবির-জামাত-জঙ্গীদের অংশ গ্রহণে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন। যারা রাজনীতির নামে অপরাজনীতি, মোসাহেবীর রাস্তা তৈরিতে পরিপক্ক। এই পরিপক্করা আছে বলেই তিস্তার বিকল্প প্রস্তাব দেয়ার মত ঔদ্ধ্যত্ব দেখানোর ক্ষমতা মমতা তৈরি করতে পেরেছেন। বলতে পেরেছেন, তিস্তায় কোনো পানি নেই। পানির অভাবে এনটিপিসির বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। সেচের জন্য পানি পেতে সমস্যা হচ্ছে। তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গে তোর্সা, জলঢাকাসহ চারটি নদী আছে। সেখানে পানি আছে। ফলে তিস্তার বিকল্প হিসেবে এই চারটি নদীর পানি ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কলকাতা সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বলেছেন, কলকাতায় বঙ্গবন্ধুর নামে ভবন হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ার হতে পারে। তাদের আলোচনায় দুই বাংলায় দু’দিন পহেলা বৈশাখ উদযাপনের বিষয়টি উঠে আসে।

চালে চৌকষ মোদি-মমতার রাজনৈতিক খেলায় আমাদের জাতির জনক কন্যা শেখ হাসিনা নিতান্তই আনাড়ি। যে কারনে নিজের ক্ষমতায় আসার আর থাকার চুক্তিটি পাকাপোক্ত করলেও দেশ-মানুষ-মাটি-পানির চুক্তিতে দূর্বলতার পরিচয় দিয়েছেন। আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে কিন্তু তা কখনোই হতো না। তিনি মেনে নিতেন না এমন নেপথ্য পরাজয়। বরং গর্জন করে বলতেন, আমাদেরকে কখনোই দাবায়ে রাখবার পারবা না।

আমরা স্বাধীনতার ৪৭ বছরে অনেক দেবেছি, আমরা আর দেবে থাকতে চাই না। আর তাই যারা এই দাবিয়ে রাখার নেপথ্য কারিগর তাদেরকে ক্ষমতাতে তো নয়-ই; রাষ্ট্রিয় কোন নতুন চুক্তিতেও দেখতে চাই না। জনগনকে কোনভাবে বোকা বানোর নতুন প্রকল্পে যারা হাত দেবে, তাদের উদ্দেশ্যে বলছি- একাত্তরের স্বাধীনতা আজো আমার হয়নি কেন? বাংলাদেশের তিস্তা-পদ্মা আজো আমার রয়নি কেন? প্রশ্নবোধক কষ্টগুলো দিচ্ছে আমার পিড়া/ শুকনো কথায় ভিজবে না আর আমজনতা চিড়া/ তিস্তা-পদ্মা প্রবাহমান নতুন করে দেখতে চাই/ ‘পদ্মা-তিস্তার মাঝি’ নিয়ে আনন্দগীত লিখতে চাই...

মোমিন মেহেদী : চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ-এনডিবি

সাম্প্রতিক