ddhgc6rfhস্টাফ রিপোর্টার: ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার, যা টাকার হিসেবে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। এরমধ্যে শুধু ২০১৪ সালেই বাংলাদেশ থেকে আরো প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। ২০১৩ সালে দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার, বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা। এভাবে গত ১০ বছরে দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। অর্থপাচারের দিক থেকে ভঙ্গুর রাজনীতির দেশ পাকিস্তানকেও বহু ধাপ পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি ওয়াশিংটনভিত্তিক অর্থপাচারবিরোধী সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইনটিগ্রিটির (জিএফআই) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে বিপুল অর্থপাচারের এমন ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরা হয়। কেবল অবৈধভাবে অর্থপাচার নয়, বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ অবৈধ উপায়ে বাংলাদেশে ঢুকছেও প্রতিবছর। অবৈধ পথে রেমিট্যান্স ঢোকায় বৈধ পথে রেমিট্যান্স আসা কমে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, দেশে জঙ্গিবাদের বিস্তারের উদ্দেশ্যেও বিদেশ থেকে অবৈধ পন্থায় অর্থ আসছে।

২০১৪ সালে বাংলাদেশে অবৈধভাবে আসা অর্থের পরিমাণ প্রায় সর্বনিম্ন ৩৩ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৬১ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত জিএফআই প্রতিবেদনে সর্বোচ্চ অর্থপাচারের দিক থেকে বিশ্বের ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ২৬তম। তবে এ বছর দেশগুলোর মধ্যে কোনো র‌্যাংকিং করেনি সংস্থাটি। তবে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুল অর্থপাচার হওয়ার এ পরিস্থিতিকে চরম উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীরা। অর্থপাচার প্রতিরোধে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে তাঁরা বলেছেন, না হলে অর্থপাচারের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদ- ঘোষণা করেও পাচার থামানো যাবে না। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ওই বছরে সারা দেশে উন্নয়ন কর্মকা-ের পেছনে সরকারের ব্যয় হওয়া অর্থের প্রায় সমান। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) পরিমাণ ছিল ৭৫ হাজার কোটি টাকা। আবার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে টাকার অঙ্কে বাংলাদেশে স্থানীয় বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণ ছিল ৯১ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। আর যে পরিমাণ বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয় তার অনেকাংশই বাস্তবায়ন হয় না। সেই হিসাবে ২০১৪ সালে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা দেশে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে, পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ (৭৩ হাজার কোটি টাকা) তার প্রায় কাছাকাছি বলেই ধরা হচ্ছে (এক ডলার সমান ৮০ টাকা ধরে এই হিসাব করা হয়েছে)।

জিএফআই বলেছে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ যে মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য করেছে, তার ৯ থেকে ১৩ শতাংশ অর্থ অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়েছে। পাকিস্তানে এ হার ১ শতাংশ, ভারতে ২ থেকে ৩ আর শ্রীলঙ্কায় ৪ থেকে ৭ শতাংশ। সংস্থাটির হিসাবে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশের মোট আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ সাত হাজার ছয় কোটি ৯০ লাখ ডলার। এর ১৩ শতাংশ অর্থপাচার হয়ে থাকলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬১ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা আমদানি-রপ্তানি পণ্যের দামে হেরফের করে পাচার হয়েছে। বাকি ১১ হাজার ২১২ কোটি টাকা নগদ পাচার হয়েছে। আর সর্বনিম্ন ৯ শতাংশ অর্থপাচার হয়েছে ধরে নিলে এর পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৯ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা পাচার হয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে। বাকি অর্থ নগদ পাচার হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ ৪৪ হাজার ৬১৫ কোটি ডলার বা ৩৫ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১২ থেকে ১৭ শতাংশ অর্থই বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে। সর্বোচ্চ ১৭ শতাংশ অর্থপাচার হয়েছে ধরে নিলে এই ১০ বছরে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ছয় লাখ ছয় হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। তবে সর্বনিম্ন ১২ শতাংশ ধরলে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়াবে চার লাখ ২৮ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছিল, ২০০৪-২০১৩ পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে পাঁচ হাজার ৫৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় এর পরিমাণ চার লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকার মতো। ২০০৫ থেকে ২০১৪ সালে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের ৭ থেকে ১২ শতাংশ আমদানি-রপ্তানির আড়ালে পাচার হয়েছে বলে জানিয়েছে জিএফআই। অর্থাৎ এই ১০ বছরে আমদানি-রপ্তানির আড়ালে মোট বাণিজ্যের ৭ শতাংশ পাচার হয়ে থাকলে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় দুই লাখ ৪৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। আর ১২ শতাংশ হিসাব করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় চার লাখ ২৮ হাজার ৪০ কোটি টাকা। আট বছর ধরেই জিএফআই অর্থ পাচারের গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও এবারের রিপোর্টটি আগেরগুলোর তুলনায় ভিন্নভাবে তৈরি করা হয়েছে। এবার তারা মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কত শতাংশ পর্যন্ত অর্থ পাচার হয়েছে, সেই তথ্য প্রকাশ করেছে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্নÑদুটি হিসাবই রয়েছে। যেমন ২০০৪ সালে বাংলাদেশ থেকে সর্বনিম্ন ৯ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ বাইরে চলে গেছে। পাশাপাশি অবৈধভাবে কী পরিমাণ অর্থ দেশের ভেতরে এসেছে, সেই তথ্যও প্রতিবেদনে দেওয়া রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তাদের দেওয়া অর্থ পাচারের সব হিসাবই রক্ষণশীল, অর্থ পাচারের প্রকৃত পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। গবেষণা পদ্ধতির পরিবর্তনের কারণে জিএফআই এবারের প্রতিবেদনে গত ১০ বছরের বছরওয়ারি হিসাব আলাদা প্রকাশ করেনি। ফলে আগের বছরের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা যায়নি।

সাম্প্রতিক