আবদুল বায়েস
motamotগেল সপ্তাহের শেষ দিনটি আমার বেশ ভালোই কেটেছে। কারণ ‘মন খুলে কথা বলা’ নামের একটা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ ঘটেছিল। অনুষ্ঠানটির আয়োজক ব্র্যাকের চিফ পিপলস অফিসার সায়েদা তাহিয়া হোসেনের পরিচালনায় মানবসম্পদ বিভাগ। এই কর্মসূচির বয়স নাকি প্রায় ১৩ বছর। অর্থাৎ ২০০৪ সাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত চলছে। সাদামাটা গোছের অনুষ্ঠানটির সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য হচ্ছে এই যে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের দরজা খোলা রাখা দরকার। রিক্রুটমেন্ট টু রিটায়ারমেন্ট, কর্মস্থলে নারী কর্মীরা নানাভাবে নিগৃহীত হন, অথচ মুখ ফুটে অভিযোগ করার সাহস থাকলেও কোনো সুযোগ থাকে না। তা ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে নারী কর্মীদের সৃজনশীল চিন্তাভাবনা কোনো গুরুত্ব পায় বলেও মনে হয় না। এমন পরিস্থিতিতে ‘মন খুলে কথা বলা’ এক নবদিগন্তের সূচনা ঘটায়। এটি এমন একটি প্রয়াস বা সুযোগ, যেখানে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে নারী কর্মীরা অভাব-অভিযোগ কিংবা প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে চিন্তাভাবনা শেয়ার করতে পারেন (ইদানীং পুরুষ কর্মীদের জন্যও সে সুযোগ সম্প্রসারিত করা হয়েছে)। মোট কথা, কর্তৃপক্ষের কাছে অনুষ্ঠানটি এতই গুরুত্ব বহন করে যে ব্র্যাকের প্রধান নির্বাহী, পরিচালকবৃন্দ ও চিফ পিপলস অফিসার স্বয়ং উপস্থিত থেকে কর্মীদের মুখোমুখি হয়ে বক্তব্য শোনেন এবং প্রয়োজনবোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তা ছাড়া সংলাপে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নারী কর্মীরা যাতে অংশ নিতে পারেন তার জন্য রয়েছে ভিডিও কনফারেন্সের ব্যবস্থা। সব দেখেশুনে মনে হবে, যেন পুরনো গ্রিসে গণতন্ত্রের মহড়া চলছে।
এই বাংলাদেশে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে খোলামেলা আলাপ-আলোচনা অনেকটাই সোনার হরিণ বললেও চলে। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে মারমার-কাটকাট জাতীয় নেতিবাচক কর্মসূচি নিয়ে ট্রেড ইউনিয়নের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় বটে, তবে কৌতুক করে এদের বলা হয় ‘মুখে শেখ ফরিদ, বগলে ইট’। অর্থাৎ আন্দোলনের নামে আখের গোছানো। আর এ-ও তো জানা কথা যে সরকারি, এমনকি বেশির ভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মন খুলে কথা বলা শাস্তিযোগ্য, একধরনের ‘বেয়াদবি’ কিংবা ইনসাবোরডিনেশন। আমাদের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান চলে কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ফাইলে। এখানে প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় হচ্ছে এমন অবস্থা সৃষ্টি করা যাতে ‘কাঁদতে কেহ পারবে নাকো যতই মরুক শোকে’। আবার কোথাও কোথাও মন খুলে বললে কথা কর্তৃপক্ষের মনের মতো না হলে বদলি কিংবা চাকরিচ্যুতির খড়্গ নেমে আসে। সব মিলিয়ে বলা চলে, জলে আর তেলে যেমন মেশে না তেমনি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোতে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যকার মন খুলে মতবিনিময়ের পর্বটি কখনো আলোর মুখ দেখে না। অথবা দেখতে পেলেও অকালেই সে উদ্যোগ ভেস্তে যায়।
আপাত প্রতীয়মান অনেকটা চিরস্থায়ী এই বিশ্বাসে যেন খানিকটা চিড় ধরালেন তাহিয়া হোসেন ও তাঁর বিভাগের এই দাওয়াত। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে ম্যাডাম, নবধারামূলক এই নতুন সংযোগের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য। মন খুলে কথা বলার সুযোগÑহোক সে রাষ্ট্রীয় কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে- গণতন্ত্রের ও অংশীদারিমূলক প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রসঙ্গত, এ কথাটাও মনে রাখতে হবে যে মন খুলে কথা বলা থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারী যেমন লাভবান হন, তেমনি অনেকটা অজান্তে ফসল উঠে কর্তৃপক্ষের ঘরেও। কেননা আখেরে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সংলাপ বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। সুতরাং মন খুলে কথা বলা মানে উইন-উইন সিচুয়েশন।
১৬ মার্চ ২০১৭, দুপুর ২টা। শুভ লগ্নটিতে ব্র্যাক অডিটরিয়ামের মেঝে দেখলাম ধবধবে সাদা চাদরে আবৃত। চারদিকে যেন উৎসবের আমেজ। একে একে আপারা আসছেন মন খুলে কথা বলার জন্য কিংবা অনুষ্ঠান উপভোগ করার জন্য। দেখতে দেখতে যোগ দিলেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক ডা. মুহাম্মাদ মুসা ও পরিচালকরাÑএস এন কৈরী, সামেরান আবেদ, কাওসার আফসানা, সাজেদা ফারিসা কবির, কে এম মোর্শেদ, আন্না মিনজ্ প্রমুখ। ব্র্যাকের বর্তমান নির্বাহী পরিচালক পেশায় একজন ডাক্তার বলে বোধ হয় প্রতিষ্ঠানের রোগ নির্ণয় ও নিরাময়ে কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারীদের মধ্যে ‘হার্ট-টু-হার্ট’ সংলাপের ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। সুযোগ পেলেই সহকর্মীদের মধ্যে তাঁর ধারণাটা পৌঁছে দেওয়ার অবকাশও খুঁজে নেন। জানা গেল, ব্র্যাকে কর্মরত ১-২ গ্রেডের মোট কর্মচারীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী; ৬-৮ গ্রেডে ১৮-১৯ শতাংশ ও ৯+ গ্রেডে ২৩ শতাংশ। এরই মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের বেশ কিছু দাবিদাওয়া পূরণ করা হয়েছে, যেমন স্কুটির জন্য ঋণসুবিধা, অতিরিক্ত পাঁচ দিনের ছুটিসহ আরো কিছু, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্টাফ ডিসকাউন্ট, মাতৃছুটির প্রাক্কালে আগাম বেতন, নমনীয় অফিস সময় ইত্যাদি।
ঠিক পাশের চেয়ারে বসা এক আপার বিড়বিড় করে ছোড়া শব্দ থেকে অনুমান করতে কষ্ট হলো না যে মন খুলে কথা বলার জন্য যে ধরনের পরিবেশ দরকার তা আছে বলে তিনি মনে করেন না। ইতিউতি করে যা বললেন তার সারমর্ম হচ্ছে, মন খুলে কথা বলতে গিয়ে যদি চাকরিটা চলে যায় অথবা অপছন্দনীয় বদলি ঘটে, তাহলে তো এটা হবে নাকের বিনিময়ে নরুন পাওয়ার শামিল। অর্থাৎ বেড়ায় যদি ক্ষেত খায় তখন কী করা? কিছুক্ষণের মধ্যে মাঝ থেকে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানাতে মাইক্রোফোন হাতে তুলে নিলেন অন্য এক আপা। তাঁর মতে, মন খুলে কথা বলার আগে মন খুলে অভিযোগপত্র দাখিলের সুযোগ দেওয়া উচিত। নির্বাহী পরিচালক কিংবা পরিচালকদের প্রতিশ্রুতির চেয়েও অধিকতর পাওয়ারফুল ইমিডিয়েট বস, যাঁর হাতে তাঁর পদোন্নতি কিংবা বদলির নাটাই। সুতরাং চুন খেয়ে মুখ পুড়েছি ভাই, এখন দই দেখলেও ভয় পাই।
আপাদের কথায় মনে পড়ল আমার ব্যক্তিগত জীবনের এক অভিজ্ঞতা। প্রথম জীবনের চাকরি ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগে (১৯৭৪ সালে)। কী কারণে জানি ব্যাংকের বড় বড় সাহেব যথা অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কিংবা গবেষণা পরিচালক আমাকে ডেকে নিয়ে তাঁদের ফ্লোরে বসিয়ে কাজ করাতেন। এটা আমার ইমিডিয়েট বসদের খুব একটা ভালো লাগত না। আমার কাজের কল্যাণে বড় বাবুদের প্রশংসা ও হাততালি পেলেও আমার বসদের দেওয়া বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে (এসিআর) আমার স্কোর থাকত খুব কমÑঅর্থাৎ গুড ফর ডিমোশন! অবশেষে অবস্থা এমন দাঁড়াল যে ওই চাকরি ছেড়ে দিয়ে কেঁদে বাঁচি! এ কথা বলার অর্থ, প্রতিষ্ঠানে কর্মরত টপ টু বটম সবার দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন না ঘটাতে পারলে মন খুলে কথা বলার পর্ব অনেকটাই অহেতুক; এ ধরনের বাক্য বিনিময় সমস্যা সমাধানের জানালা খুলে দিলেও দরজা খুলে দেবে কি না সন্দেহ রয়ে যায়।
অনুষ্ঠানে প্রায় এক ঘণ্টার উপস্থিতিতে বেশ মজার কিছু ঘটনার কথা জানা গেল। নানা বাহানা ও টালবাহানায় নারী কর্মীদের প্রতি অবিচার করার অভিযোগ আছে। প্রমোশনের প্রসঙ্গ উঠলেই বস বা ‘ভাই’ বলবেন, ‘আপনার না শ্বশুরবাড়ি গুলশানে, ভাইও তো বেশ বড় চাকরি করেন বলে শুনেছি। তো আপনার প্রমোশনের দরকার কী আপা?’; ‘অত টাকা-পয়সা দিয়া কী করবেন’; ‘প্রমোশন পেলে ফিল্ডে যেতে হবে, সেটা তো আপনার দ্বারা হবে না’; ‘আপনাদের একটা না একটা সমস্যা লেগেই থাকেÑআজ বাচ্চা, কাল স্বামী, পরশু শ্বশুর-শাশুড়ি, এত ঝামেলা নিয়ে চাকরি কেন?’ এবং ইত্যাদি ইত্যাদি। মাঠপর্যায়ে মহিলা কর্মীদের নানা ধরনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়, মাঝেমধ্যে পুরুষ কর্মীদের কাছ থেকে অশোভন আচরণ তো আছেই।
একজন গবেষক হিসেবে মনে মনে ভাবলাম, মন খুলে কথা বলার অনুষ্ঠানটি একটি কেস স্টাডি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এমনিতে ব্র্যাক সম্ভবত বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নারী-সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান। এর রয়েছে আলাদা জেন্ডার ও জাস্টিস বিভাগ এবং রয়েছে দরিদ্র মহিলাদের আইনি সহায়তা দেওয়ার কর্মসূচি; মোট ২২ জন পরিচালকের (সর্বোচ্চ পদ) মধ্যে ৯-১০ জন নারী। আগেই বলেছি যে ১-২ গ্রেডের মোট কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মহিলা, যে অংশ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন স্যার ফজলে হাসান আবেদ তাঁর ৮০তম জন্মদিনে একটা চরম আক্ষেপের কথা শুনিয়েছিলেন আর সেটা হলো, সমাজের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর দুর্বল অবস্থান ও প্রতিনিধিত্ব। ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানে মন খুলে কথা বলা থেকে যা বেরিয়ে আসে তাতে মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে যে বাংলাদেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে নারীর অবস্থান অধিকতর অন্ধকারময়। আমরা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মেয়েদের অধিক হারে অন্তর্ভুক্তির ডুগডুগি বাজিয়ে চলেছি, এর ওপরে যে তাদের যাওয়া দরকার সে কথাটা কস্মিনকালেও মনে করি বলে মনে হয় না। অথচ মেয়েরা সবই পারে, এমনকি প্লেন চালাতে, মিসাইল ছুড়তে। ব্র্যাক গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগের নারী গবেষকরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে যে হাতে তথ্য সংগ্রহ করছেন, ফিরে এসে সেই হাতে প্রতিবেদন লিখছেন। আবার ঘুমে আচ্ছন্ন সন্তানটিকে দুই হাতে কাঁধে রেখে ডে-কেয়ারে দিচ্ছেন। নারী সবই পারেন যদি পুরুষশাসিত সমাজ মানসিকতা বদলায়। মন খুলে কথা বলতে দাওÑহোক সে রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা পারিবারিক পর্যায়ে। শুধু নামকাওয়াস্তে জানালা খুললেই হবে না, খুলতে হবে সদর দরজা। তা হলেই ঘটবে নারীমুক্তি, দেশের উন্নয়ন।

সাম্প্রতিক