স্টাফ রিপোর্টার: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বন্ড সুবিধার অব্যবহার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে। সে লক্ষ্যে গঠন করা হচ্ছে বিশেষ টাস্কফোর্স। আর ওই টাস্কফোর্সকে কাজের সুবিধার জন্য বিশেষ ক্ষমতা দেয়া হবে। এমনকি তদন্তের প্রয়োজনে টাস্কফোর্স কর্মকর্তারা আমদানি-রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ, যে কোনো ফাইল তলব ও জব্দ করতে পারবে। আর প্রাথমিক তদন্তে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগেই বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় আনা যাবে। তার মধ্যে রয়েছে দোষি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর ও লাইসেন্স স্থগিত, বন্ড সুবিধা বাতিল, হিসাব জব্দ, ফৌজদারি আইনে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ইত্যাদি। আর সব দাফতরিক প্রক্রিয়া শেষ হলে আগামী ১ জুলাই থেকেই ওই টাস্কফোর্স কাজ শুরু করবে। এনবিআর সংশ্লিষ্ট সূত্রে ওসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সাম্প্রতিক সময়ে এনবিআর কোন কোন খাতে বেশি রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হচ্ছে তা চিহ্নিত করেছে। বাণিজ্যের আড়ালে মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে এদেশ থেকে অর্থপাচারের ৮০ শতাংশের ঘটনা ঘটছে। আর প্রতিবছর শুধুমাত্র বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত দুর্নীতিবাজ প্রতিষ্ঠানগুলোই আমদানি-রফতানিতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি পাচার করছে। ফলে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের কারণে বছরে প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতিনিধিরা দেশ থেকে অথপাচার রোধে বৈঠক করেছে। ওই বৈঠকে অর্থপাচারের অন্যতম কারণ হিসাবে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকে দায়ি করা হয়। শতভাগ রফতানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল শুল্কমুক্তভাবে আমদানির জন্য সরকার বন্ড সুবিধা বহাল রেখেছে। তবে সেক্ষেত্রে শর্ত হলো আমদানি করা কাঁচামালের সবটুকু কারখানায় ব্যবহার করতে হবে এবং খোলাবাজারে তা বিক্রি করা যাবে না। তাছাড়া বন্ড সুবিধার আওতায় পরিচালিত কারখানার আমদানি-রফতানিতে মিথ্যা তথ্য দেয়া যাবে না।
ওসব শর্ত ভঙ্গ করলে বন্ড সুবিধা বাতিল হবে। শর্ত ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় আনারও বিধান রয়েছে। তার পরও বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধ করা যাচ্ছে না।
সূত্র জানায়, সারাদেশে বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রায় ৯ হাজার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের আওতায় আছে প্রায় ৬ হাজার প্রতিষ্ঠান। আর বন্ড সুবিধার তালিকায় সবচেয়ে বেশি আছে তৈরি পোশাক শিল্প-কারখানা। তার মধ্যে কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান কাগজ ও কাগজ জাতীয় পণ্যও আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। দেশে উৎপাদিত একই মানের কাগজের তুলনায় বিনা শুল্কে আনা কাগজ টনপ্রতি ২০ হাজার টাকা কমে বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে সঙ্কটে পড়েছে দেশি কাগজশিল্প। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনে নেই বন্ড সুবিধার আওতায় থাকা এমন প্রায় আড়াই হাজার প্রতিষ্ঠানের নামে ২৩৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা পাচার হয়েছে। আর বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে একেবারে অস্তিত্বহীন ৩২৪টি প্রতিষ্ঠান পাচার করেছে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। আবার উৎপাদনে থাকা ৫৬২ প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে ৮৩৮ কোটি ২১ লাখ টাকার অনিয়ম করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যে এনবিআর বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের তদন্ত প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর দফতর, অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। শুধুমাত্র তদন্তই নয়, ১ হাজার ৭৬০ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সও স্থগিত করেছে এনবিআর। আর ১৩২ প্রতিষ্ঠানের হিসাব জব্দ করা হয়েছে। তাছাড়া ৭২৬ জনের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৪৩ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের মামলা হয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বন্ধে বিশেষ টাস্কফোর্সে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর, এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি), শুল্ক মূল্যায়ন ও নিরীক্ষা অধিদফতর, ট্রান্সফার প্রাইসিং সেল, ট্যাক্সসেস অ্যান্ড লিগ্যাল এনফোর্সমেন্ট সেলের একাধিক কর্মকর্তা থাকবে। তাছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দুদকের প্রতিনিধিদেরও তাতে রাখতে আগ্রহী এনবিআর। এমনকি আমদানি-রফতানির কাজে ব্যবহৃত বন্দরের কর্মকর্তাদেরও প্রয়োজনে টাস্কফোর্সে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। টাস্কফোর্স গঠিত হলে কোনো প্রতিষ্ঠানের কী পরিমাণ কাঁচামাল আমদানির অনুমতি আছে এবং তার বিপরীতে কতোটুকু আমদানি করা হয়েছে তা খতিয়ে দেখতে পারবে।
সেক্ষেত্রে বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কী পরিমাণ কাঁচামাল কেনা হয়েছে, এলসির মাধ্যমে কতো অর্থ পাঠানো হয়েছে ওসব তথ্য-প্রমাণ টাস্কফোর্সকে জানাতে বন্ড সুবিধাপ্রাাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য থাকবে। প্রয়োজনে টাস্কফোর্স সদস্যদের বিদেশি প্রতিষ্ঠানেও নিয়ে যাবে। তাছাড়া বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা কাঁচামাল ব্যবহার করে কী পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করেছে, কোন বন্দরে ওই পণ্য রফতানির জন্য পাঠিয়েছে ওসব তথ্যও টাস্কফোর্সের কর্মকর্তারা যাচাই করতে পারবে। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে বাধ্য থাকবে। আর তা না করলে ওই প্রতিষ্ঠানের সব নথি তলব ও জব্দ করতে পারবে টাস্কফোর্স।
এ প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান জানান, বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকারীরা জোটবদ্ধ হয়ে অপকর্ম চালাচ্ছে। ওই চক্র ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে এনবিআর। বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং তাদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। পাশাপাশি সৎ ব্যবসায়ীরাও এই অনিয়ম বন্ধে এনবিআরকে সহযোগিতা করছে।
< Prev | Next > |
---|