ctg portস্টাফ রিপোর্টার: শিল্প কারখানার যন্ত্রপাতি ঘোষণা দিয়ে শুধুমাত্র ১২টি কনটেইনারের মাধ্যমেই আনা হয়েছিল মদ, সিগারেট, এলইডি টিভিসহ ১৩৪ কোটি টাকার পণ্য। আর মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ৯০ কন্টেইনার অবৈধ পণ্য আনার প্রক্রিয়ার সাথে কাস্টমস কর্মকর্তা, ব্যাংক কর্মকর্তা ও স্ক্যানিং মেশিন পরিচালনাকারী সংস্থার লোকজনসহ সংশ্লিষ্ট অনেকেই জড়িত। গত ৬ মার্চ দু’টি চালানে আসা ১২ কন্টেইনার অবৈধ পণ্য আটক করে কাস্টমসের শুল্ক গোয়েন্দারা। পরে উদ্ঘাটিত হয় একই প্রতিষ্ঠানের নামে আরো ৭৮ কন্টেইনার পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বেরিয়ে গেছে। ধারণা করা হয় সেগুলোতেও একই ধরণের আরো কয়েক হাজার কোটি টাকার অবৈধ পণ্য ছিল। ঘটনা তদন্তে নামে কাস্টমসের শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। দীর্ঘ তদন্তে দেখা যায় পণ্য পাচারে ব্যাংক কর্মকর্তা, কাস্টমসের এআইআর শাখার রাজস্ব কর্মকর্তা, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা, স্ক্যানিং কাজে নিয়োজিত সার্ভেয়ার প্রতিষ্ঠানের লোকজনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট বিভাগের আরো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পণ্যপাচারে জড়িত ছিল কিনা তা ব্যাপক তদন্তে বের হয়ে আসবে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। কাস্টমসের শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বন্দরে মালামাল খালাসে প্রক্রিয়াগত ত্রুটি এবং জবাবদিহির অভাবে অনেক ক্ষেত্রে চোরাচালান প্রক্রিয়া সহজ হচ্ছে। তাতে একে অপরের ওপর দোষারোপের পথ প্রশস্ত হয়।

কোন সংস্থা বা ব্যক্তি তাদের নিজেদের জড়িত থাকার কথা সরাসরি স্বীকার করে না। বন্দর দিয়ে পণ্য পাচারের ঘটনায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার পাশাপাশি প্রভাবশালী সংঘবদ্ধ চক্রও জড়িত।

গত এক বছরে সর্বমোট ১৭টি কনসাইনমেন্টের মাধ্যমে ৯০ কন্টেইনার চোরাচালান পণ্য মিথ্যা ঘোষণায় নিয়ে আসা হয়। এগ্রোফিড কারখানার জন্য ক্যাপিটাল মেশিনারিজ বা শিল্প কারখানার যন্ত্রপাতি আমদানিতে ঋণপত্র খোলে ওসব আমদানি কার্যক্রম চালানো হয়। ঋণপত্র খোলা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ম্যানেজার ব্যাংকে বসেই প্রতিবেদন তৈরি করে। ক্যাপিটাল মেশিনারিজের নামে যে দু’টি স্থানে কারখানার কথা বলা হয় বাস্তবে ওই দুই ঠিকানায় তার কোন অস্তিত্ব নেই। বরং ঋণপত্র খোলার জন্য আইআরসি, ভ্যাট রেজিস্ট্রেশনসহ সকল জাল ডকুমেন্ট ব্যাংকের সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশ এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় তৈরি করা হয় বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানাতে পারেন। সেজন্য তদন্ত কমিটি ব্যাংকের ম্যানেজার ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে। এক বছর ধরে ১৭টি কনসাইনমেন্ট আনার ক্ষেত্রে একটি ব্যাংক থেকেই ঋণপত্র খোলা হলো, অথচ এরকম প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্বই নেই।

সূত্র জানায়, আমদানি মালামাল চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছার পর ক্যাপিটাল মেশিনারিজের ক্ষেত্রে আমদানিকারক বা শিল্প কারখানার মালিক ওসব সামগ্রী সরাসরি কন্টেইনার ভর্তি অবস্থায় কারখানার স্থানে নিয়ে যেতে পারে। আমদানিকারক ‘অনচেসিস’ ডেলিভারির জন্য আবেদন করলে কাস্টমসের স্টাফ শাখায় কাগজপত্র পরীক্ষা করে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে পণ্য খালাসের সময় এআইআর (অডিট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিচার্স) শাখা কর্তৃক যাচাই করার কথা বলা হয়। ক্যাপিটাল মেশিনারিজের নামে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কাগজপত্র ভালোভাবে পরীক্ষা ছাড়াও অনচেসিস ডেলিভারির সময় এআইআর শাখা থেকে কর্মকর্তা উপস্থিত থাকেন। নতুন আমদানির ক্ষেত্রে অবশ্যই কন্টেইনার খুলে দেখা হয়। এআইআর শাখার দায়িত্বশীল রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) কর্তৃক সংশ্লিষ্ট ক্যাপিটাল মেশিনারিজের জন্য একজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাকে (এআরও) দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট এআরও তদন্ত দলকে জানায়, এ ব্যাপাওে তিনি কিছু জানেন না। সেক্ষেত্রে পণ্য ছাড়ের কাগজে যে স্বাক্ষর সিল রয়েছে তা জাল। অথচ এক বছর ধরে ১৫টি চালান চট্টগ্রাম কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোর চোখ ফাঁকি দিয়ে অনচেসিস ডেলিভারির মাধ্যমে ট্রেলারে করে অজ্ঞাত গন্তব্যে চলে গেছে।

সূত্র আরো জানায়, অনচেসিস ডেলিভারির ক্ষেত্রে এআইআর শাখা কঠোর নজরদারি করে থাকে। অথচ এক বছর ধরে একই প্রতিষ্ঠানের নামে ৭৮টি কন্টেইনারের একটিরও কায়িক পরীক্ষা ছাড়া শুধুমাত্র স্ক্যানিংয়ের রিপোর্টের ভিত্তিতেই এক বছর ধওে যথারীতি গেট দিয়ে যেতে দেয়া হয়। কিন্তু শুল্ক গোয়েন্দা শাখা থেকে ওই সকল কন্টেইনারের ব্যাপারে এসজিএস’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেও কাছে জানতে চাইলে তারা জানায়, কন্টেইনারগুলো স্ক্যানিং হয়নি। কিন্তু তাদের অ্যাকাউন্ট থেকে গেটে প্রাপ্ত রিপোর্টের ব্যাপারে জানতে চাইলে জানানো হয়, তাদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে।

এদিকে এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমসের যুগ্ম-কমিশনার গিয়াস উদ্দিনকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু ওই কমিটি এখনো রিপোর্ট দেয় হয়নি।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার এএফএম আবদুল্লাহ খান জানান, তদন্ত রিপোর্টে অপেক্ষায় রয়েছেন। তার সাথে চট্টগ্রাম কাস্টমসের কেউ জড়িত থাকলে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সাম্প্রতিক