মাহমুদুল বাসার
ফুটপাতে ফুলের গল্প

motamotজাতির জনক বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে ও উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, বাংলাদেশে মত প্রকাশের পথ রুদ্ধ বলে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সম্প্রতি যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তার পেছনে রাজনেতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। যুক্তরাজ্য ভিত্তিক এ মানবাধিকার সংস্থাটি অপরাধীর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। আমি সন্দেহ করছি যে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কিছু রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছে। তারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় একটি পুতুল সরকার আনতে চায়। ‘বিশ্ব মুক্ত সাংবাদিকতা’ দিবসের আগের দিন গত মঙ্গল বার বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি বলেছে, মত প্রকাশের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতার পাশাপাশি সরকার বাক স্বাধীনতা খর্ব করতে খড়গহস্ত। ভিন্ন মত দমনে সব কিছুই করছে সরকার। এই বক্তব্যের জন্য অ্যামনেস্টির বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়।

তিনি বলেন, ১/১১ থেকেই একটি ব্যাপার খুব পরিষ্কার যে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আর কোনো মানবাধিকার সংগঠন নয়। জয় বলেন, সম্প্রতি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেখানে তারা দাবি করে, গণমাধ্যমে স্বাধীনতা সীমিত করা হচ্ছে। আমাদের দেশে সাংবাদিকদের হয়রানি করা হচ্ছে। তারা উদাহরণ হিসেবে শফিক রেহমান ও মাহফুজ আনামের কথা উল্লেখ করেছে।

শফিক রেহমান একজন সাবেক মার্কিন এফবি আই এজেন্টের সঙ্গে দেখা করেন উল্লেখ করে জয় তার ফেইসবুক টাইমলাইনে আরো উল্লেখ করেন, আমার সম্পর্কে তথ্যের জন্য ওই এজেন্টকে শফিক রেহমান ঘুষ দেন। সাবেক এই এজেন্ট ও তার দুই সহকর্মী এখন যুক্তরাষ্ট্রের জেলে আছেন। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের ওয়েব সাইটে এই সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। এমন কি যদি আমরা এই সত্যকে সরিয়ে দেই যে, তার এক সহযোগী মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে স্বীকার করেছে যে, তিনি আমাকে অপহরণ ও হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিলেন। শফিক রেহমান এফ বি আই এজেন্টকে ঘুষ দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। শফিক রেহমান যদি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতেন, তাহলে তিনিও এখন জেলেই থাকতেন। (ইত্তেফাক-৭-৫-১৭)। 

আগেও যুক্তরাজ্য ভিত্তিক অ্যামনেস্টির উস্কানিমূলক বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশে তোলপাড় হয়েছে। অভিযোগ উঠেছিলো, ‘অ্যামনেস্টি এবং টিআইবি বিএনপি- জামায়াতের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে বক্তব্য দিয়েছে।’ (যায় যায় দিন-২/১১/১৫)। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে ‘শক্ত জবাব’ দিয়েছিলো বাংলাদেশ সরকার। লন্ডন ভিত্তিক আন্তর্জাতিক তথাকথিক মানবাধিকার সংগঠনটি শুরু থেকে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদীর রায় প্রকাশের পর অ্যামনেস্টি বলেছিলো, ‘একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধারাও গুরুতর অপরাধ
করেছিলেন। কিন্তু এজন্য একজনের বিরুদ্ধেও কোনো তদন্ত কিংবা বিচার হয়নি।’(যায় যায় দিন-২/১১/১৫)।

যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি, স্বাধীন দেশের গর্বিত নাগরিক হবার গৌরব অর্জন করেছি, তাদের সম্পর্কে অ্যামনেস্টির যে বক্তব্য তাতে সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত হয় যে, বাংলাদেশ সরকারকে বিকৃত রূপে চিত্রিত করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের গণমাধ্যম সম্পর্কে মনগড়া প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। অ্যামনেস্টি সম্পর্কে সজীব ওয়াজেদ জয়ের যে মতামত তুলে ধরেছি, তা অনুপুঙ্খুভাবেই সত্য।
বাংলাদেশের গণমাধ্যম পৃথিবীর যে কোনো দেশের চেয়ে বেশি স্বাধীন। এত পত্রিকা, এত টিভি চ্যানেল আর কোন্ দেশে আছে? আমরা তো মনে করি স্বয়ং সরকার গণমাধ্যমের চাপের মুখে আছে। সারা দেশের শতাধিক পত্রিকার মধ্যে আওয়ামীলীগের নিজস্ব কোনো পত্রিকা নেই। এক সময় ছিলো প্রয়াত যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মণির দৈনিক ‘বাংলার বাণী’। অনেক দিন হলো তা বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমান বাংলাদেশের শত শত পত্রিকার মধ্যে হাতে গোণা ২/১ টা পত্রিকা কখনো সখনো সরকারকে সহানুভ’তি দেখিয়ে থাকে। আর গড়ে শতকরা নিরানব্বই ভাগ পত্রিকা সরকারের কঠোর সমালোচক। তাছাড়া বরাবর এক শ্রেণির গণমাধ্যম আওয়ামীলীগ সরকারের তিলকে তাল করে দেখিয়ে আসছে। এখনো যে কোনো পত্রিকাই প্রয়োজনে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে নির্মম ও নির্দয় বিশ্লেক হতে কসুর করে না। সরকার সমর্থকরা আমার জানামতে, বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো খুলতেও সাহস পায় না। কারণ খুললেই দেখে টকশোতে সরকারের দাড়ি, কমাহীন সমালোচনা। প্রায় প্রতিদিন আমরা বিবিসির বিশ্লেষণ পাচ্ছি পত্রিকায়। তাতে থাকছে সরকারের কঠোর সমালোচনা। ড. কামাল হোসেন এবং কাদের সিদ্দিকী নির্ভয়ে, বুকটান করে সরকার সম্পর্কে বক্তব্য দিচ্ছেন, প্রতি সপ্তায় কলাম লিখছেন। তাহলে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত হলো কীভাবে?
বাংলাদেশে দৈনিক সংগাম, দৈনিক দিনকাল, দৈনিক ইনকিলাব এবং প্রথম আলো,যুগান্তর স্বমূর্তিতেই প্রকাশিত হচ্ছে। সরকার মাথা ঘামায় না এ সব পত্রিকা নিয়ে। তাহলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা দমন-পীড়নের শিকার হলো কীভাবে? শফিক রেহমান এবং মাহফুজ আনাম সম্পর্কে সজীব ওয়াজেদ জয়ই বলেছেন, আমি আর সেদিকে যেতে চাই না।
অতি সম্প্রতি বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘আওয়ামীলীগের পালাবার সময় হয়েছে।’ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকলে এ ধরনের হুমকি প্রকাশ পেতো না।
প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে, পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িকতার অনুপ্রবেশ নিয়ে, আদালত প্রাঙ্গণে গ্রীক জাস্টিশিয়া ভাস্কর্য নিয়ে, হাওর এলাকার অকাল বন্যা নিয়ে, ভারতের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক চুক্তি নিয়ে যে যা বলেছেন, যে যেভাবে সরকারের সমালোচনা করেছেন তা গণমাধ্যমে অকৃপণভাবে প্রকাশিত হয়েছে। সরকার বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়েও কখনো গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে যায় নি। এমন হতে পারে সরকার গণমাধ্যমকে পক্ষে রাখার একটা কৌশল অবলম্বন করছে, কিন্তু অ্যামনেস্টির গণমাধ্যম দমনের অভিযোগ একেবারে ভিত্তিহীন।

মাহমুদুল বাসার
কলামলেখক ও গবেষক

সাম্প্রতিক