স্টাফ রিপোর্টার: যমুনা সারকারখানার উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় লাভের মুখ দেখছে কারখানাটি। উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে দক্ষ জনবল সংকটেও রয়েছে বলে জানা গেছে। সরকার নিয়ন্ত্রিত বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প সংস্থা (বিসিআইসি) এর অত্যাধুনিক উচ্চ প্রযুক্তি সম্পন্ন এশিয়া মহাদেশের অন্যতম দানাদার ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড। এটি জামালপুরের সরিষাবাড়ীর তারাকান্দিতে যমুনা নদীর পূর্ব তীরে প্রায় ২০০শত একর ভূমির উপর অবস্থিত। কারখানাটির আয়ুস্কাল ২৫ বছর বেধে দিয়ে জাপানের মিটসুবিশি হেভী ইন্ড্রাষ্ট্রীজ লিঃ নির্মান করেন। যা সময় অতিক্রান্ত হয়েও চালু রয়েছে।
কারখানাটির প্রাক্কলিত ব্যায় বৈদেশিক মুদ্রা-৯২০১৮.৪০ ও স্থানীয় মুদ্রা-৩১৭০৫.৯০ লক্ষ টাকা,মোট ১২৩৭২৪.৩০ লক্ষ টাকা।এর অর্থ যোগানকারী সংস্থা জেবিআইসি (ওইসিএফ),জাপান ও বাংলাদেশ সরকার/বিসিআইসি।কারখানার কাচামাল প্রাকৃতিক গ্যাস প্রাপ্তিতে তিতাস গ্যাস কোম্পানীর সাথে সম্পাদিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী ৩৭০ পিএসআইজি চাপে দৈনিক ৪৬.০ এমএমসিএফ গ্যাস সরবরাহ’র চুক্তি করা হয়।ওই চুক্তি’র ভিক্তিতে ১৯৯১ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর পরীক্ষামূলক এবং ১৯৯২ইং সালে ১লা জুলাই থেকে দৈনিক ১৭’শ মেঃটন ইউরিয়া সার ও বাৎসরীক ৫লাখ ৬১ হাজার মেঃটন সার এবং দৈনিক ১০৭৮মেঃটন ও বাৎসরিক ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭ শত ৪০ মেঃটন এ্যামোনিয়া উৎপাদন ক্ষমতা নিয়ে বাণিজ্যকভাবে উৎপাদন শুরু করে।
কারখানার উৎপাদিত সার ১৯৯২ সালে প্রতি মেঃটন সারের বিক্রিয় মূল ৪ হাজার ৮শত টাকা নির্ধারন করে সরকার। ২০০৮-২০০৯ অর্থ বছরে কারখানার উৎপাদিত সারের বাজার মূল্য সরকারী সিদ্ধান্তে ১০ হাজার টাকা নিধারন করলে লাভের মূর্খ দেখে কারখানাটি। কারখানাটিতে কর্মরত রয়েছে-৮৯৪ জন,পে-রোল /লিয়েন/ পি আর এল ১৯ জন সহ সর্বমোট ৯১৩ জন। এ ছাডাও কর্মক্ষম হয়েছে এলাকার হাজার হাজার মানুষ।
জেএফসিএল সূত্রে জানা গেছে ২০১০-২০১১অর্থ বছর গ্যাস সংকটে সার উৎপাদন ভয়াবহ রূপ ধারন করে। একপর্যায়ে সরকারী সিদ্ধান্তে গ্যাস প্রত্যাহার ও গ্যাসের চাপ কম থাকায় এবং যান্ত্রিক ত্রুটিতে ১৯২দিন কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকে। অবশিষ্ট ১৭৩দিন গ্যাসের চাপ কম থাকার ফলে নির্ধারিত লক্ষমাত্রা ৩,৩০,০০০ মেঃ টন এবং সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১,৮৯,০০০ মেঃ টন। গ্যাস স্বল্পতায় উৎপাদন হয় ১,৬৩,৯০৭ মেঃ টন। ২০১১-১২ অর্থবছরের প্রথম দিকে গ্যাস সংকটে যমুনা সার কারখানার উৎপাদন প্রায় দুইমাস বন্ধ থাকা সত্ত্বেও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সময়োপযোগী নির্দেশনায় অর্থবছরের পরবর্তী ১০ মাসে এ কারখানায় লক্ষ্যমাত্রা দুই লাখ ৩৫ হাজার মেঃ টনের স্থলে তিন লাখ ২৭ হাজার ৫১২ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদিত হয়। বেশি উৎপাদিত হয় ৯২হাজার ৫১২ মেঃটন সার। যার বাজার মূল্য প্রতি মেঃটন ১৮ হাজার টাকা দরে ১৬৬ কোটি ৫২ লক্ষ ১৬ হাজার টাকা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। ২০১২-২০১৩ অর্থ বছরে লক্ষমাত্রা ছিল ৩,৮০,০০০ মেঃটন অর্জিত হয় ১,৮৬,২৮৭ মেঃটন। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হয় ১,৯৩.৭১৩ মেঃ টন। ২০১৩-২০১৪ অর্থ বছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ অর্জিত হয় ৩,৬০,৩০৯ মেঃ টন। কম উৎপাদন হয় ৪৯,৬৯১ মেঃটন। ২০১৪-২০১৫ অর্থ বছরে লক্ষ্য মাত্রা ৪ লাখের স্থলে ৪,৭৪,৭৭৭ মেঃটন বেশি ৭৪,৭৭৭ মেঃ টন বেশি উৎপাদন হয়।যার বাজার মূল্য প্রতি মেঃটন ১৪ হাজার টাকা দরে ১০৪কোটি ৬৮ লক্ষ৭৮ হাজার টাকা মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়। ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরে ৪ লাখ ৫০ হাজারের স্থলে ৪,৫৭,৭০২ মেঃ টন বেশি ৭,৭০২ মেঃটন উৎপাদন হয়। যার বাজার মূল্য ১০কোটি ৭৮লক্ষ ২৮ হাজার টাকা বেশি মুনাফা অজর্ন করা হয়।
এদিকে গ্যাস প্রবাহ কারখানার চাহিদানুযায়ী চাপে ১,৭০০মেঃটন সার উৎপাদনে ৩৭০ পিএসআই চাপ সম্পন্ন ৪৬ এমএমসিএফডি উন্নত করার লক্ষে কারখানার নিজস্ব অর্থে ২৬.৫০ কোটি টাকায় ন্যাচারাল গ্যাস বুষ্টার কমপ্রেসার স্থাপন করায় উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়াও সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে গ্যাস টারবাইন জেনারেটর (জিটিজি)স্থাপনের কাজ স¤পন্ন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সচল রেখে এ কারখানায় সার উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় কারখানার শ্রমিক,কর্মচারী,কর্মকতা বাৎসরীক লভ্যাংশ পেয়ে উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাজে বেড়েছে মনোযোগ। ন্যাশনাল প্রোডাকটিভিটি অর্গানাইজেশন(এনপিও)থেকে উৎপাদনশীলতায় ২০১৪ ও ২০১৫ ইং সালে পুরস্কৃত হয়েছে কারখানাটি।এ সারকারখানার উৎপাদিত দানাদার সার উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলা এবং টাঙ্গাইল,শেরপুর,জামালপুর সহ ১৯ জেলায় ইরি-বোর’র পিক সিজনে কৃষকের চাহিদা পূরন করছে।
সূত্র জানায়,যমুনা সারকারখানার উৎপাদিত মোট সারের মধ্যে দুই লাখ ৩০হাজার দুই শত ৩৫ মেট্রিক টন সার ইতোমধ্যেই বিক্রি করা হয়েছে। এতে আয় হয় ৩২২কোটি ৩২লাখ ৯০হাজার টাকা। চলতি বোরো মৌসুমে এই সার বিক্রি করা হবে।এ সার কারখানায় বর্তমানে গড়ে প্রতিদিন এক হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন সার উৎপাদিত হচ্ছে তা গতকাল পর্যন্ত মজুদ রয়েছে ২১ হাজার মেঃটন। আরো জানা গেছে কারখানার উৎপাদিত সার কারখানার আবাসিক কলোনীতে ও বিভিন্ন ভাকা স্থানে ত্রিফল দিয়ে স্তুুপী করা সার ডেকে রাখা হয়। যার ফলে সার নষ্ট হওয়া একং কারখানার পরিবহন খরচ প্রতিরোধে গুদাম স্থাপন করা জরুরী বলে দাবী করেনে অনেকেই।
কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়া সুষ্ঠ,নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে চালু’র জন্য দক্ষ প্রকৌশলী এবং রসায়নবিদ/রসায়ন প্রকৌশলী রয়েছে।এ দক্ষ প্রকৌশলীদের বিদেশে প্রচুর চাহিদা থাকায় বেশী বেতনের আশায় তারা চাকুরীতে ইস্তফা দিয়ে চলে যান। ফলে কারখানার লোড ৮০% থেকে ৫৫% উঠা নামায় সার্বক্ষনিক প্ল্যান্ট মনিটরিং এবং এ্যাডজাষ্টম্যান্ট করার প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া এমটিএস বিভাগের বিভিন্ন শাখায় নির্ধারিত সংখ্যক প্রকৌশলী নেই। তাই রক্ষনা বেক্ষন কাজে সমস্যা সৃষ্টি হয়।যার ফলে উৎপাদনে প্রভাব পড়ে। বর্তমানে টেকনিক্যাল ক্যাডার ভুক্ত এবং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অনুমোদিত ১০১+৮৬=১৮৭ জনের স্থলে রয়েছে ৬৭+৭৬=১৪৩ জন। টেকনিক্যাল ক্যাডার ভুক্ত ৪৪ জন কর্মকর্তা কম থাকায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি’র কারখানা চালানো ঝুকিপূর্ন ও অসনীয় হয়ে পড়েছে দীর্ঘদিন ধরে।
এ দিকে দীর্ঘ ১৮ বছর পর ২০১৬ইং সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী তারিখে জেএফসিএল শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন নির্বাচনে“রবিউল-শাহজাহান”পরিষদের পূর্ন প্যানেল বিজয়ী হয়।ওই বিজয়ী প্যানেল কারখানার শ্রমিক কর্মচারীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ঠ ও উন্নয়নমূলক কর্মকা- পরিচালনার জন্য সুষ্ঠ,নিয়মতান্ত্রিকভাবে দায়িত্ব পালন,কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়ায় লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর,শ্রমিক কর্মচারীদের অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি,সময়মত ওভার টাইম বিল পরিশোধ করতে ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষের আশুদৃষ্টি কামনা করেছেন জেএফসিএল শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি রবিউল ইসলাম,উর্ধবতন সহ সভাপতি মোসলেম উদ্দিন,সাধারন সম্পাদক মো.শাহজাহান,মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার তারাকান্দি শাখার কমান্ডার শহিদুর রহমান। তারা আরো জানান কারখানার উন্নয়নে তাদের শ্রম অব্যহত রেখেছেন।
কারখানার ব্যাবস্থাপনা পরিচালক জ্যোতিষ চন্দ্র রায় বলেন-যমুনা সার কারখানা ন্যাচারাল গ্যাস বুষ্টার কমপ্রেসার স্থাপন করা হয়েছে। ফলে যমুনা সারকারখানার সার উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় কারখানা লাভের দিকে ধাবিত হয়েছে। তিনি আরও জানান কারখানার সার উৎপাদনে চাহিদানুযায়ী গ্যাস সরবরাহ থাকলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে অন্যথায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বাধাগ্রস্থ হবে।
Next > |
---|