kakraস্টাফ রিপোর্টার: হুমকির মুখে পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সন্তাবনাময় খাত কাঁকড়া রপ্তানি। জানা গেছে, অযথা হয়রানি এবং অবাস্তব রপ্তানি নীতিমালার কারণে এমন অবস্থায় দেশের এক হাজার কোটি টাকার বৃহৎ এই রপ্তানি খাত।

বাংলাদেশ লাইভ অ্যান্ড চিল্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, ১৪৩টি প্রতিষ্ঠান বিমানের কার্গো দিয়ে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ টন জীবিত কাঁকড়া ও কুঁচে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে থাকে। এ রপ্তানি খাতটির বয়স খুব একটা বেশি নয়। ১৯৮৭ সাল থেকে এ দেশ থেকে জীবিত কাঁকড়া-কুঁচে রপ্তানি শুরু হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৮ সালে এ ধরনের প্রাণী রপ্তানি নীতিমালা করা হয়। সেই নীতিমালায় বলা হয়েছে, পুরুষ কাঁকড়া প্রতিটি ২০০ গ্রাম এবং স্ত্রী কাঁকড়া ১৩০ গ্রামের নিচে রপ্তানি করা যাবে না।

বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ আইনের আওতায় এ নীতিমালাটি করা হয়েছে। এ নীতিমালায় শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সম্প্রতি দুটি চালানের তিন হাজার কেজি কাঁকড়া আটক করে বাংলাদেশ লাইভ অ্যান্ড চিল্ড ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের কাছে হস্তান্তর করেন।

অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা পরীক্ষা করে দেখেন মোট কাঁকড়ার পাঁচ থেকে ছয় ভাঁড় পাঁচ থেকে ১০ গ্রাম কম। টানাহেঁচড়া এবং সময়ক্ষেপণের ফলে বিমানবন্দরের কার্গোতেই শতকরা ৩০ ভাগ কাঁকড়া মারা যায়। পরবর্তী সময়ে অবশিষ্ট কাঁকড়া চীনে পাঠালে আরো শতকরা ৩০ ভাগ মারা যায়। এর ফলে চীন থেকে পুরো শিপমেন্ট বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। এ ঘটনাটি অন্য বায়াররা সহজেই জেনে যায়। এতে গত এক মাস ধরে কাঁকড়া রপ্তানির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

এব্যাপারে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁকড়া সাধারণত উপকূলবর্তী বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ সুন্দরবন এলাকায় চাষাবাদ হয়ে থাকে। সেখান থেকে দীর্ঘ পথপরিক্রমায় প্রাণীগুলো ঢাকায় আসার পর দেখা যায় তাদের শরীর থেকে পানি শুকিয়ে গিয়ে কিছুটা ওজন কমে যায়। সাধারণত প্রাকৃতিকভাবে কাঁকড়া জলবিয়োগ ঘটায়। অনেক সময় কাঁকড়ার একটি পা খসে পড়লে তার ওজন পাঁচ থেকে ছয় গ্রাম কমে যায়। এ ধরনের ছোটখাটো অজুহাতে রপ্তানিযোগ্য মালামাল আটকে দিলে এ খাতটি সহজেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাবে।

সূত্রমতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিদেশে ২০০ ও ১৩০ গ্রামের ওজনের কাঁকড়ার চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। চীন, জাপান, তাইওয়ান কিংবা থাইল্যান্ডের মানুষ এর চেয়ে কম ওজনের কাঁকড়াই বেশি পছন্দ করছে। নীতিমালার কোনো বাঁধাধরা না থাকায় ভারত, মিয়ানমারসহ অন্যান্য দেশ কাঁকড়া রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বাজার দখল করে নিচ্ছে।

শুধু রপ্তানির বাজারই নয়, বাংলাদেশ থেকে ছোট-বড় কাঁকড়া পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে পাচার হয়ে যাচ্ছে। সেখান থেকে অতি সহজেই সেগুলো বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে পাট, চায়ের মতো কাঁকড়া-কুঁচে রপ্তানি খাতটিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে ৫০ থেকে ১২০ গ্রাম ওজনের কাঁকড়ার চাহিদা ভালো। সেই চাহিদা সামনে রেখে বাংলাদেশের কক্সবাজার, সাতক্ষীরা, খুলনা, পাইকগাছা প্রভৃতি এলাকায় ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই কাঁকড়া-কুঁচের ফার্ম গড়ে তুলেছে।

সেখানে ৫০ থেকে ১২০ গ্রাম ওজনের কাঁকড়া হিমায়িত করে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের মাধ্যমে রপ্তানি করা হচ্ছে। কোনো কোনো চাষি এ ধরনের কাঁকড়া উৎপাদন করে স্বর্ণপদকও লাভ করেছে। চিংড়ির চেয়ে কাঁকড়ায় বেশি লাভ হচ্ছে বলে অনেক চাষি এদিকেই বেশি ঝুঁকছে। তাই এ ব্যবসার স্বার্থে যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন সেটা তারা গ্রহণ করবে। প্রয়োজনে পুরনো নীতিমালা পরিবর্তন, পরিমার্জন করতেও আপত্তি নেই।

এদিকে, বাংলাদেশে কাঁকড়ার চূড়ান্ত প্রজননকাল মে-জুন মাস। অথচ রপ্তানি নীতিমালায় কাঁকড়ার প্রজনন সময়কাল জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এ সময়কালে বন বিভাগ থেকে কাঁকড়া সংগ্রহ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। যার কারণে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে অগ্রসরমাণ এ রপ্তানি খাতটির ওপর।

কাঁকড়া রপ্তানিকারকরা জানায়, সাধারণত পরিবেশ অধিদপ্তর কাঁকড়া চাষাবাদ ও রপ্তানির বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু সুন্দরবন এলাকার পাশাপাশি কাঁকড়া চাষ করলে সেটি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে বন বিভাগ। ফলে একই বিষয়ে দ্বৈত শাসন কায়েম হয়েছে। এর ফলে এ খাতে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তাই রপ্তানি নীতিমালাটি সংস্কার করে কাঁকড়ার চাষাবাদ ও রপ্তানির বিষয়টি একই ছাতার নিচে আনা দরকার। এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারলে এ খাতটি দেশের জন্য আরো বেশি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে।

রপ্তানিকারকরা জানান, কাঁকড়া রপ্তানি এমন একটি খাত যাতে সরকারের কোনো আর্থিক প্রণোদনা, ব্যাংক ঋণ কিংবা অন্যান্য সাহায্য-সহযোগিতার দরকার পড়ে না। বরং উপকূলবর্তী এলাকার লাখ লাখ হতদরিদ্র মানুষ কাঁকড়া চাষের সঙ্গে জড়িত হয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। এটি এমন একটি পণ্য যার কোনো বাজার বাংলাদেশে নেই। সেই পণ্যটি বিদেশে রপ্তানি হয়ে পুরো টাকাই দেশের অর্থনীতে যুক্ত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক