রবিবার, আগস্ট ১৪, ২০২২
Homeবাংলাদেশরেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের অধিকাংশ রুটেই নতুন ইঞ্জিন ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের অধিকাংশ রুটেই নতুন ইঞ্জিন ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না

বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান ১০টি রেল রুটের মধ্যে ৬টি রুটেই আমদানি করা নতুন ইঞ্জিন ব্যবহার করতে পারছে না। ওই রুটগুলো হচ্ছে চট্টগ্রাম-সিলেট, চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ, ঢাকা-নোয়াখালী, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ ও ঢাকা-ময়মনসিংহ। আর শুধুমাত্র ঢাকা-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম-চাঁদপুর, ঢাকা-পঞ্চগড়, ঢাকা-রাজশাহী রুটে নতুন ইঞ্জিন ব্যবহার করা যাচ্ছে। যদিও যাত্রীসেবার মান বাড়াতে রেলওয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, অত্যাধুনিক ইঞ্জিন ও কোচ আমদানিসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল বিনিয়োগ করা হয়েছে। গত এক যুগে বাংলাদেশ রেলওয়েতে সরকারের বিনিয়োগের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু রেলের উদাসীনতা, অদূরদর্শিতায় ওই বিনিয়োগের অনেকাংশই কাজে আসেনি। মূলত রেলওয়ে পুরনো জীর্ণ সেতু, পুরনো ট্র্যাক, প্লাটফর্ম এবং প্লাটফর্ম শেডের কারণে দেড় বছর আগে আমদানি হওয়া ৩০টি মিটার গেজ ইঞ্জিনের যথাযথ ব্যবহার করতে পারছে না। বাংলাদেশ রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত ২০২১ সালে থেকে রেলওয়ের পরিবহন ও মেকানিক্যাল বিভাগের কাছে পর্যায়ক্রমে কোরিয়া থেকে আমদানি হওয়া ৩০টি ইঞ্জিন হস্তান্তর করা হয়। কিন্তুরেলওয়ে নতুন ইঞ্জিনগুলোর মাত্র এক-তৃতীয়াংশ যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারছে। যাত্রী পরিবহন রেলের সবচেয়ে অগ্রাধিকারের জায়গা হলেও সেক্ষেত্রে মাত্র ১১টি নতুন ইঞ্জিন ব্যবহার হচ্ছে। আর পণ্য পরিবহনে ব্যবহার হচ্ছে ১০টি ইঞ্জিন। বাকি ৯টি ইঞ্জিন জরুরি প্রয়োজন, তাৎক্ষণিক ব্যবহার এবং রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনে ফেলে রাখা হয়েছে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়েতে আগে যে ইঞ্জিনগুলো ছিল সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভারিগুলোর গড় ওজন প্রতি এক্সেলে ১১ দশমিক ৯৬ লোডের হিসাবে (প্রতিটি ইঞ্জিনে ৬ এক্সেল) ৭০-৭২ টন। বর্তমানে আমদানি হওয়া ও আমদানির প্রক্রিয়ায় থাকা ইঞ্জিনগুলোর গড় ওজন ১০০ টনেরও বেশি (প্রতি এক্সেলে ১৫-১৬ টন)। মূলত সর্বশেষ প্রযুক্তির ইঞ্জিন হওয়ায় ওসব ইঞ্জিন এক্সেল লোডের হিসাব থেকেও ভারি হয়। ওই কারণে আমদানি হওয়া নতুন ইঞ্জিনগুলো প্রায় শতবর্ষী পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন সেতুর ওপর দিয়ে যাতায়াত করতে পারছে না। সেতুগুলোর মধ্যে রয়েছে কালুরঘাট রেলওয়ে সেতু, ভৈরব পুরনো সেতু, কুশিয়ারা সেতু, ঘোড়াশাল (আপ) সেতু, শম্ভুগঞ্জ সেতু, ঘুমঘাট সেতু ও ছাতক-সিলেট রুটের ২৮ নং সেতু। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ওসব সেতু দিয়ে বর্তমানে ১১ দশমিক ৯৬ টন এক্সেল লোডবিশিষ্ট লোকোমোটিভ/কোচ নিয়ন্ত্রিত গতিসীমায় চলাচল করে। কিন্তু নতুন ১৫-১৬ টন এক্সেল লোডের ইঞ্জিনগুলো চালাতে গেলে ওসব সেতু সংস্কার বা নতুন সেতু নির্মাণ করতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে ইঞ্জিন আমদানির পর লোড-সংক্রান্ত সঙ্কটে সম্প্রতি এক্সেল লোড বাড়িয়ে পুরনো সেতুগুলো দিয়ে নতুন ইঞ্জিনগুলো চালাতে বুয়েটের সহায়তা নিচ্ছে রেলওয়ে। ইতোমধ্যে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বুয়েটের পরামর্শ মেনে সংস্কারকাজ শেষ হলেই ওসব সেতু দিয়ে নতুন ইঞ্জিনগুলো চলাচল করতে পারবে। তবে ওই পুরো প্রক্রিয়াটিই সময়সাপেক্ষ। আর সেটি না হওয়া পর্যন্ত আমদানি করা নতুন ইঞ্জিনগুলো ব্যবহার করাও সম্ভব হবে না। আর নতুন আমদানি করা ৬ এক্সেল লোডের ইঞ্জিনগুলো রেলের অন্তত ৭টি গুরুত্বপূর্ণ পুরনো সেতু দিয়ে চলাচল করতে পারবে না। আবার দীর্ঘদিনের পুরনো রেলপথ, স্টেশন প্লাটফর্ম, স্টেশন শেডের কারণেও ওসব ইঞ্জিন নির্দিষ্ট কিছু রুট ছাড়া ব্যবহার অনুপযোগী। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই ইঞ্জিনগুলো পূর্বাঞ্চলের ঢাকা-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম-চাঁদপুর এবং পশ্চিমাঞ্চলের ঢাকা-পঞ্চগড়, ঢাকা-রাজশাহী রেলপথে চালানো হচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, রেলপথ মন্ত্রণালয় বিগত ২০১৮ সালে ১০টি মিটার গেজ লোকোমোটিভ সরবরাহে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ২৯৭ কোটি ৬৩ লাখ ৩০ হাজার ৫৬০ টাকা ব্যয়ে ওসব ইঞ্জিন কেনা হয়। সরকার একই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২০টি ডিজেল ইলেকট্রিক রেল ইঞ্জিনও কিনেছে। তাতে ব্যয় হয়েছে ৮৪১ কোটি ২৩ লাখ টাকা। জি-টু-জি পদ্ধতিতে কেনা ওসব ইঞ্জিন ২০২১ সেপ্টেম্বর থেকে রেলের বহরে যুক্ত হয়। ৩০টি নতুন ইঞ্জিন কিনতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে কিংবা আমদানির জন্য চুক্তি হওয়ার পর বিদ্যমান রেলপথ ও আনুষঙ্গিক সংকট দূর করতে ব্যবস্থা না নেয়ায় বিপুল ব্যয়ে আমদানি করা ইঞ্জিনগুলোর প্রকৃত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। ইঞ্জিন সঙ্কটে চাহিদা থাকার পরও রেলওয়ে নতুন নতুন ট্রেন সংযোজন করতে পারছে না।
এদিকে রেলওয়েতে দীর্ঘদিন ধরেই ইঞ্জিন সঙ্কট রয়েছে। প্রতিদিন ১১৬টি ইঞ্জিনের চাহিদা থাকলেও ৯৫ থেকে ১০০টি ইঞ্জিন দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। বিদ্যমান ইঞ্জিনগুলোর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় রেলওয়ের পরিবহন বিভাগকে ঝুঁকি নিয়েই ট্রেন পরিচালনা করতে হয়। তাতে প্রায়ই ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটছে। অথচ নতুন ইঞ্জিন আমদানি করেও সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে মোট লোকোমোটিভের সংখ্যা ছিল ১৭০টি। কিন্তু দুই-তৃতীয়াংশ ইঞ্জিনই মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় রেলওয়েকে নিয়মিতভাবে দৈনিক ৯০-৯৫টি ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করতে হতো। ২০২১ সালে ৩০টি ইঞ্জিন আমদানি হলে পর্যায়ক্রমে বেশকিছু ইঞ্জিন স্ক্র্যাপ করে ফেলা হয়। বর্তমানে পূর্বাঞ্চলের মোট ইঞ্জিনের সংখ্যা ১৫৯টি। প্রতিদিন পরিবহন বিভাগ থেকে গড়ে ১১৬টি ইঞ্জিনের চাহিদা থাকলেও পাওয়া গেছে ১০০টি। ফলে দৈনিক ১২ থেকে ১৬টি ইঞ্জিনের ঘাটতি নিয়েই রেলওয়েকে সারা দেশে ট্রেন পরিচালনা করতে হয়। আর যাত্রী পরিবহনে নতুন আমদানি হওয়া ৩০ ইঞ্জিনের মাত্র ১১টি ব্যবহার করা যাচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী পণ্যবাহী ট্রেনগুলোতে পুরনো ইঞ্জিন ব্যবহার করে যাত্রীবাহী ট্রেনে নতুন ইঞ্জিনের ব্যবহার হয়। কিন্তু বর্তমানে সব রুটে চালানো সম্ভব না হওয়ায় যাত্রীবাহী ট্রেনের প্রায় সমপরিমাণ নতুন ইঞ্জিন পণ্যবাহী ট্রেনে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাতে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে ৩০টি ইঞ্জিন আমদানি করা হলেওতা প্রকৃত সুফল রেলওয়ে পাচ্ছে না।
অন্যদিকে রেল সংশ্লিষ্টদের মতে, পূর্বাঞ্চল রেলের অন্যতম জনপ্রিয় রুট ঢাকা-সিলেট রেলপথ। পুরনো সেতু ও রেলপথের কারণে এখন পর্যন্ত রেলওয়ে ওই রুটে নতুন ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করতে পারছে না। তবে বেশকিছু সমস্যা সমাধান করে কিছুদিনের মধ্যে ঢাকা-নোয়াখালী রুটে রেলওয়ে নতুন ইঞ্জিনগুলোর ট্রায়াল রান শুরু করবে। বাকি রুটগুলোতে ভারি ওসব লোকোমোটিভ দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করার জন্য রেলওয়েকে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন করতে হবে। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সেতু। ফলে কোরিয়ান ৬ এক্সেল লোডের ইঞ্জিনগুলোর শতভাগ উপযোগিতা পেতে রেলওয়েকে আরো কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে। তাছাড়া ২০২১ সালে সরকারি রেল পরিদর্শক, ঢাকার জিআইবিআর পরিদর্শনে উঠে আসে নারায়ণগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও দেওয়ানগঞ্জ বাজার স্টেশনের প্লাটফর্ম শেডের উচ্চতা এবং কুলাউড়া স্টেশনের ১, ২ ও ৩ নং প্লাটফর্ম শেডের উচ্চতা-সংক্রান্ত জটিলতার কথা। পরিদর্শনে দেখা যায় নতুন মিটার গেজ লোকোমোটিভগুলোর উচ্চতা থেকে ওসব শেডের উচ্চতা কম। ফলে ওই প্লাটফর্ম শেডগুলো নতুন করে নির্মাণের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া জিআইবিআর ইন্সপেকশনে ট্র্যাকের মান খারাপ থাকায় পূর্বাঞ্চলে চলাচলরত সেকশনগুলোতে এক্সেল লোড কোনো অবস্থায় নির্ধারিত সীমা অতিক্রম না করে চলাচল করতে নির্দেশনা দেয়া হয়।
এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, কোরিয়া থেকে আমদানি হওয়া ইঞ্জিনগুলো আগের লোকোমোটিভের তুলনায় বড় ও ভারি। ফলে ওসব ইঞ্জিন পুরনো সেতু ও রেললাইনে চলাচল করানো যাবে না। ওই কারণে সীমিত কিছু পথে চালানো হচ্ছে। যেসব রেলপথে চালানো যাচ্ছে না সেগুলোর উন্নয়নে বেশকিছু কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। আশা করা শিগগিরই অন্য রুটগুলোতেও নতুন আমদানি হওয়া লোকোমোটিভ দিয়ে ট্রেন চালানো সম্ভব হবে।

আরও খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_img

পপুলার পোস্ট

নতুন কমেন্টস