বেলাল হোসেন ঢালী
প্রতীকী ছবিমৃত্যুর পর থেকে শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত মৃতদেহের আশ্রয়স্থানকে কবর বলা হয়। আর মৃত মানুষকে কবরস্থ করাকে বলা হয় ‘দাফন’। মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের মৃতদেহ মাটিতে দাফন করা হয়। অন্যদিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে হিন্দুদের মৃতদেহ আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদম (আ.)-এর ছেলে কাবিল তার ভাই হাবিলকে হত্যা করে কবর দিয়েছিল। এটাই পৃথিবীর প্রথম কবর। মৃত্যুর পর প্রত্যেক মুসলমানের ঠিকানা হবে এই কবরে।


মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই।
যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।।

কবর নিয়ে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই অমূর্ত বাণী যেন প্রত্যেক মুসলমানের মৃত্যু-পরবর্তী স্বপ্ন ।

মা-বাবা মারা গেলে সন্তানেরা যেমন চায় মসজিদের পাশেই তার মা-বাবার কবর দিতে, ঠিক তেমনি সন্তান মারা গেলেও মা-বাবারা চান তাঁদের সন্তানের কবর ঠিক মসজিদের পাশেই দিতে। এমনকি প্রত্যেক মুসলমানই চান তাঁর আত্মীয়স্বজনকে যতটা সম্ভব মসজিদের পাশে কবর দিতে।

আমরা যারা প্রবাসে থাকি, তাদের কথা একটু ভিন্ন। ইচ্ছা করলেই মসজিদের পাশে কবর দেয়া সম্ভব নয়। মসজিদ তো দূরের কথা, অনেক সময় বা অনেক স্থানে মুসলিম কবরস্থান পাওয়াই দুষ্কর হয়ে যায়। তাই যারা প্রবাসে থাকেন, তাঁরা অসুস্থ হলে বা অনেকে আগে থেকেই বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজনকে জানিয়ে রাখেন কবরটা যেন তাঁর পছন্দের জায়গায় দেয়া হয় কিংবা লাশটা যেন দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

যেমন আমিও একবার আমার স্ত্রীকে বলেছিলাম, আমি মরে গেলে আমার লাশটা যেন দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আমার কবরটা যেন আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে আমার বাবার পাশে দেওয়া হয়। আমার স্ত্রী আমার কথাটা তেমন সিরিয়াসলি নিয়েছেন বলে মনে হলো না। তিনি হয়তো ভেবেছেন আমি ইয়ার্কি করছি। তাই আমি একদিন আমাদের বরিশালে বড় ভাই, মোস্তাক ভাইকেও কথাটা বলেছিলাম। সে তখন বলেছিল, “ভাই, আপনার আগে আমিও তো মারা যেতে পারি। তবে যদি বেঁচে থাকি, আপনার কথাটা আমি রাখব।” ধন্যবাদ মোস্তাক ভাইকে। মরেও আমি শান্তি পাব এই জেনে যে আমার কবর‍টা অন্তত আমার মা-বাবার কবরের পাশে আমাদের মসজিদের সাথেই হবে।
কিন্ত বাস্তবতা অনেক কঠিন।বাস্তবতার কাছে আবেগ মূল্যহীন। সময় ও পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে মাঝেমধ্যে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেক ইচ্ছাকে কবর দিতে হয়। আবার আমাদের এই ইচ্ছাটা কতটুকু যুক্তিসংগত, তা-ও ভেবে দেখা দরকার।

প্রতিটি প্রাণীর জন্য মৃত্যু অবধারিত। মৃত্যু থেকে পালানোর কোনো পথ নেই। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, কুল্লু নাফসিন যা-ইকাতুল মাওত” “প্রতিটি প্রাণকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে।” [সূরা আল ইমরান, আয়াত ১৮৫]

মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের সফলতা, মুক্তি, শান্তি লাভের ইচ্ছা ও চেষ্টা সব ধর্মের অনুসারীরাই করেন। এগুলো একান্তই ধর্মীয় ও বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল। এই অস্ট্রেলিয়ায় মুসলমান ছাড়াও অন্যান্য ধর্মের লোকজন তাঁদের প্রিয়জনের কবরে গিয়ে ফুল দিয়ে আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন কিংবা মৃত ব্যক্তির আত্মা যাতে শান্তিতে থাকে, তার জন্য প্রার্থনা করেন।

সমস্যাটা এখানেই। প্রতিটি সন্তানের কাছে প্রিয় তার মা-বাবা। এই সন্তানেরা
যখন মা-বাবা হন, তখন তাঁদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় হয় তাঁদের সন্তানেরা। তাই মা-বাবা মানে আমাদের কবর যদি নিজ দেশে দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের সন্তানদের পক্ষে কি সম্ভব হবে প্রতিবছর দেশে গিয়ে মা-বাবার মানে আমাদের কবর জিয়ারত করা! অসম্ভব। তা ছাড়া লাশ দেশে পাঠানো অনেকটা ব্যয়বহুল। সেটা হয়তো সবার জন্য সমস্যা নয়। আবার কারো কারো পক্ষে সমস্যা হলেও সেটা কোনো না কোনোভাবে সমাধান হয়ে যায়।

অনেকে মনে করেন, মা-বাবার কবর এখানে দিলে তাঁরা মারা যাওয়ার সাথে সাথে দেশে তাঁদের পরিবার-পরিজন কিংবা দেশের সাথে আমাদের সন্তানদের সম্পর্কটাও ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাবে। তাই মা-বাবাকে দেশে নিয়ে কবর দিলে ছেলে-মেয়েরা মা-বাবার মৃত্যুদিবসে প্রতিবছর না হলেও দু-এক বছর পর পর দেশে যাবে; মা-বাবার কবর জিয়ারত করবে। এতে করে মা-বাবার পরিবার বা দেশের সাথে আমাদের সন্তানদের একটা সম্পর্ক বজায় থাকবে। মূলকথা হচ্ছে, এভাবে শেকড়ের সাথে সম্পর্কটা যত দিন ধরে রাখা যায়।

এই অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশিরা প্রথম এসেছেন আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ইতোমধ্যে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে অনেকেই মারা গেছেন, কিন্তু কজনের লাশই-বা দেশে পাঠানো সম্ভব হয়েছে? বেশির ভাগ লাশই এখানে কবর দেওয়া হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে রকউড মুসলিম কবরস্থান মুসলমানদের মাঝে অনেক জনপ্রিয়। আমাদের কমিউনিটির বেশির ভাগ মুসলমানকেই এখানে কবর দেয়া হয়।

মৃত্যু সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক বলেছেন, “মাটি থেকেই আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি, এরই মধ্যে আমি তোমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাব এবং এই মাটি থেকেই পুনরায় তোমাদের বের করব।”
[সুরা ত্বা-হা, আয়াত ৫৫]

অস্ট্রেলিয়া একটা মাল্টিকালচারাল দেশ। এখানে বিভিন্ন দেশের ও বিভিন্ন ধর্মের লোকের বসবাস। স্বাভাবিকভাবেই এক ধর্মের লোকের সাথে অন্য ধর্মের লোকের বিয়ে বা ভালোবাসার সম্পর্ক হতে পারে। তখন দুই ধর্ম পালনকারী মা-বাবার ঘরে জন্ম নেওয়া সন্তানেরা কোন ধর্ম পালন করবে, সেটা একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। যদি মা-বাবার মাঝে মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং থাকে, সেটা কোনো সমস্যা নয়। আর যদি মা-বাবা যাঁর যাঁর ধর্ম পালনে কঠিন অবস্থানে থাকেন, সেখানে কিছুটা সমস্যা হওয়াই স্বাভাবিক। আর এই ধর্মকর্ম থেকেই কবর দেওয়া নিয়ে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এখানে ছোট্ট একটি উদাহরণ দিচ্ছি, আমি যতটুকু শুনেছি, আমাদের এই সিডনিপ্রবাসী জনপ্রিয় এক ব্যক্তি বাংলাদেশের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও বিয়ে করেছিলেন খ্রিস্টান পরিবারে। এরপর তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এই অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করেন। ভদ্রলোক বাংলাদেশে গিয়ে হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মারা যান। ভদ্রলোককে তাঁর পরিবারের লোকজন মুসলিম নিয়ম অনুযায়ী যখন দাফন করতে বা কবর দিতে যাচ্ছিলেন, সমস্যা বাধে তখনই। ভদ্রলোকের স্ত্রী ও সন্তানেরা খ্রিস্টান ধর্মের নিয়ম অনুযায়ী কবর দিতে চাচ্ছিলেন। অনেক বাদানুবাদের পর পরিশেষে স্ত্রী ও সন্তানের ইচ্ছা অনুযায়ী খ্রিস্টান ধর্মের প্রথা মেনেই কবর দেওয়া হয়।
প্রবাসে জন্ম নেওয়া আমাদের নতুন প্রজন্ম ধর্মকর্মের চেয়ে বাস্তবতাকে বেশি বিশ্বাস করে। তাই আমাদের প্রত্যেক মা-বাবার উচিত আমাদের সন্তানদের আমাদের ধর্মশিক্ষা দেওয়া এবং সেই সাথে আমরা মারা গেলে আমাদের সন্তানেরা যাতে আমাদের কবর দেওয়া বা আমাদের ধর্ম নিয়ে কোনো ধরনের দ্বন্দ্বে না পড়ে অথবা কোনো ধরনের সমস্যা যেন ওদের অবুঝ মনকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে, সেই অনুযায়ী নির্দেশনা দিয়ে যাওয়া। তাই মরার আগেই আমাদের প্রত্যেক প্রবাসীকে ভাবতে হবে আসলে আমরা প্রবাসে মারা গেলে আমাদের কবরটা কোথায়, কীভাবে হওয়া হবে।

এখানে স্মরণ রাখা প্রয়োজন, মানুষ মারা গেলে তার কবর যেখানেই দেয়া হোক না কেন, এমনকি যেসব ব্যক্তিকে আগুনে পুড়িয়ে, পানিতে ডুবিয়ে দেয়া হবে কিংবা হিংস্র পশু খেয়ে ফেলবে, এসব ক্ষেত্রেও পরকালে প্রত্যেককে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে এবং প্রত্যেকে তাঁর কর্ম অনুযায়ী ফল পাবে। এটা কোরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা আছে। একে অস্বীকার করা উপায় নেই।
[সূরা ফুসসিলত, আয়াত: ৩০]
[সূরা আল-মু'মিন, আয়াত: ৪৫-৪৬]

সাম্প্রতিক